কৃষিতে কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ নারীদের পরিবেশবান্ধব ব্যবসা গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে ৪ লাখ ৪৭ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দিচ্ছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। এ অর্থের একটি অংশ ব্যয় হবে কীটনাশকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আধুনিক করা এবং কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানোর কাজে। বাকি অর্থ দিয়ে গ্রামীণ নারীদের পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণে সহায়তা করা হবে।
২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকায় এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মধ্যে দুটি চুক্তি সই হয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি স্বাক্ষর করেন।
মোট অনুদানের মধ্যে ২ লাখ ডলার ব্যয় করা হবে চার বছর মেয়াদি কীটনাশক ব্যবস্থাপনা জোরদারের প্রকল্পে। অন্যদিকে, গ্রামীণ নারীদের পরিবেশবান্ধব ব্যবসা গড়ে তুলতে ২৪ মাস মেয়াদি উদ্যোগে দেওয়া হবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ডলার।
কীটনাশকের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আধুনিক করার উদ্যোগ
কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা জোরদারে নেওয়া প্রকল্পটির নাম ‘কীটনাশকের জীবনচক্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি’। চীন সরকারের কৃষি ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার চীন-দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা কর্মসূচির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো কীটনাশকের ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলা। এ জন্য কীটনাশকসংক্রান্ত বিধিবিধান হালনাগাদ করা, ডিজিটাল নিবন্ধনব্যবস্থা চালু ও উন্নত করা এবং আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাশাপাশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। কৃষিপণ্যে ব্যবহৃত কীটনাশকের মাত্রা নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে এ ধরনের পরীক্ষার গুরুত্ব রয়েছে। এর পাশাপাশি কৃষকদের নিরাপদে কীটনাশক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করার কর্মসূচিও নেওয়া হবে।
প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ৩০ শতাংশের বেশি সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ অতিরিক্ত মাত্রায় পাওয়া যায়। এ তথ্য খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। কৃষিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত বা অনুপযুক্ত ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং কার্যকর নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে শুধু আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন করলেই হবে না; সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ এবং কৃষকদের বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। কীটনাশক ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি, নির্ধারিত মাত্রা এবং ফসল সংগ্রহের আগে প্রয়োজনীয় বিরতিকাল সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা বাড়ানো গেলে খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
পরিবেশবান্ধব ব্যবসায় যুক্ত হবেন গ্রামীণ নারীরা
দ্বিতীয় প্রকল্পটির নাম ‘গ্রিন রুটস উইমেনস ফার্ম ল্যাবস’। বাংলাদেশ ও উগান্ডায় পরীক্ষামূলকভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ নারীদের পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা এবং তাঁদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে সহায়তা করা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কৃষক মাঠবিদ্যালয় পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে। এর আওতায় গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, উপযুক্ত প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা হবে এবং অর্থায়ন ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করা হবে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে নারীরা পরিবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর ও টেকসই ব্যবসায়িক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি অর্থায়ন এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা গেলে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে।
গ্রামীণ নারীদের অনেকেরই ব্যবসা শুরু করার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত। এসব বাধা দূর করতে সমন্বিত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
দুটি প্রকল্পের লক্ষ্য আলাদা হলেও এগুলো বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে কৃষিপণ্যে কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং খাদ্যে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি কমানো প্রয়োজন। অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় উন্নত নিবন্ধন, কার্যকর তদারকি ও পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে কৃষিতে নিরাপদ চর্চা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো হলে কীটনাশকের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান আরও উন্নত হতে পারে।
অন্যদিকে, গ্রামীণ নারীদের পরিবেশবান্ধব ব্যবসায় যুক্ত করতে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও বাজারের সুযোগ একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটির সুফল দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। তবে এসব প্রকল্পের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়ন, সহায়তার কার্যকর ব্যবহার এবং উপকারভোগীদের জন্য তৈরি হওয়া সুযোগ কতটা টেকসই হচ্ছে, তার ওপর।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এই অনুদান তাই শুধু দুটি পৃথক উদ্যোগে অর্থায়ন নয়; বরং নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি সুযোগ। প্রকল্প দুটির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা উন্নয়ন এবং গ্রামীণ পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব ব্যবসা সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

