চট্টগ্রাম শহরে নদীর পাড়ে অবসর কাটানোর নতুন জায়গা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে নির্মাণাধীন সড়ক ও বাঁধ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাকলিয়া এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে নদীর পাড় ধরে হাঁটার পথ, পর্যটকবান্ধব রেস্তোরাঁ এবং শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা রাখার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর বিনোদনের নতুন সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নদীতীরের এই এলাকার উন্নয়নেও গতি আসতে পারে। পরিকল্পনাটি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।
চউকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনকেন্দ্রটি বাস্তবায়িত হবে কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে। এর অংশ হিসেবে শাহ আমানত সেতু থেকে বলিরহাট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় হাঁটার পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রের মূল অংশ হবে প্রায় তিন কিলোমিটার। সেখানে নদীর দৃশ্য উপভোগ করার ব্যবস্থা, বসার জায়গা, রেস্তোরাঁ ও শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক সুবিধা গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন চউকের কর্মকর্তারা। তবে এসব সুবিধা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা থাকবে, তা নিয়ে বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জানা প্রয়োজন।
এই উদ্যোগের পেছনে শুধু পর্যটন নয়, নগর যোগাযোগ উন্নত করার লক্ষ্যও রয়েছে। কালুরঘাট থেকে চাক্তাই পর্যন্ত সড়কটি চালু হলে সিটি বাইপাস লুপ রোড এবং অক্সিজেন কুয়াইশ সংযোগ সড়কের মাধ্যমে ঢাকা চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে বলে আশা করছে চউক। কাপ্তাই, রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী থেকে আসা যানবাহনকে শহরের কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে না গিয়ে বিকল্প পথে বিমানবন্দর, পতেঙ্গা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোর ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যানজট কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে সড়কটি পুরোপুরি চালু হওয়ার পর যানবাহনের চলাচল এবং সংযোগ সড়কগুলোর কার্যকারিতার ওপর।
চউকের প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাসের বরাতে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছে, প্রায় ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির নির্মাণকাজ ৯৪ শতাংশ শেষ হয়েছে এবং বাকি কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এর আগে আগস্টে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে কাজের অগ্রগতি ৯২ শতাংশ বলা হয়েছিল। অর্থাৎ, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অগ্রগতির হিসাবে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সড়ক ও বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্পটিতে নগরের জলাবদ্ধতা কমানো, নদীতীর সুরক্ষা এবং আধুনিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যবস্থাও রয়েছে। খালগুলোর মুখে জোয়ারের পানি ঠেকানোর জন্য রেগুলেটর ও পাম্প হাউস স্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি শেষ হলে এর সুফল শুধু যাতায়াত বা বিনোদনে সীমাবদ্ধ না থেকে নগরের পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কাজে আসতে পারে।
প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের জুনে। চউকের প্রকল্প-তথ্যে দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। তবে এ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিন্ন অঙ্কও পাওয়া যায়। বাসসের ২০২৬ সালের আগস্টের এক প্রতিবেদনে ব্যয় ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা বলা হয়েছিল। ফলে প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় সম্পর্কে সর্বশেষ অনুমোদিত হিসাব থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এবং পরিকল্পিত সুবিধাগুলো বাস্তবে চালু করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বাকলিয়াকে চট্টগ্রামের তুলনামূলকভাবে কম উন্নত এলাকার একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন চউকের চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যটনকেন্দ্রটির উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ অথবা যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নদীর পাড়ে পর্যটনকেন্দ্র গড়ার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নয়। নদীর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, সব বয়সী মানুষের প্রবেশের সুযোগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে কর্ণফুলীর তীর কেবল একটি নতুন সড়ক বা বিনোদনস্থল হয়ে থাকবে না; বরং চট্টগ্রাম শহরের মানুষের জন্য নদীকেন্দ্রিক জনপরিসর হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

