ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক-রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি নতুন করে চাপে পড়তে পারে। এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধির গতি কমেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে রপ্তানিকারকদের মধ্যে।
গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিস, লিওঁ, মার্সেই ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই দিন ইতালির মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। ফ্রান্স ও ইতালির পাশাপাশি বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায়। ফলে ইউরোপে ভোক্তাদের ব্যয় ও কেনাকাটার ধরনে পরিবর্তন এলে দেশের রপ্তানিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমান অস্থিরতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং আমদানি চাহিদায় এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
ইউরোপে যায় পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশ গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। এ সময়ে বাজারটিতে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলারের পোশাক, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কম।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় বাজারগুলোর মধ্যে জার্মানিতে গেছে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ, স্পেনে ৯ দশমিক ৩১, নেদারল্যান্ডসে ৫ দশমিক ৬১, ফ্রান্সে ৫ দশমিক শূন্য ৯ এবং ইতালিতে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
আগের অর্থবছরে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ সাম্প্রতিক অস্থিরতার আগেই ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাজারে রপ্তানি কমছিল।
তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কিছুটা ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি।
এ সময়ে স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, পোল্যান্ডে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং সুইডেনে ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে ফ্রান্সে রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ, ইতালিতে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং জার্মানিতে দশমিক ১৫ শতাংশ।
ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমার ইঙ্গিত
ইউরোপের ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার কম পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রপ্তানিকারকেরা। ইউরোপে পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমএস ডায়িং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ডার কম। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান অস্থিরতার আগেই বাজারে মন্দার কারণে ক্রয়াদেশ কমে এসেছিল।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পর্যটন ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য বিক্রিও প্রভাবিত হতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন।
ইউরোপের বড় পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়কৌশলেও পরিবর্তন আসছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স ও প্রাইমার্কের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে নেওয়া কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, মিসরসহ অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে।
একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহের সময় কমানোর লক্ষ্যেই ক্রেতারা বিভিন্ন দেশে পণ্য সংগ্রহের উৎস ছড়িয়ে দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনামূলক কম খরচও ক্রয়াদেশ বণ্টনে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতাও বড় চ্যালেঞ্জ
ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের মতে, ইউরোপের অস্থিরতা বিশ্বজুড়েই ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বেশি।
তিনি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, শ্রম অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে বিরোধ এবং ব্যবসার পরিবেশে স্থিতিশীলতার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, রপ্তানি কার্যক্রমের নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত কীভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তা-ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
ইউরোপে আমদানি কমেছে, বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির মূল্য ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো থেকে কমে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই পতন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমার হারের প্রায় তিন গুণ।
নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইউরোপের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য তা বড় উদ্বেগের কারণ হবে। এমনিতেই ইউরোপের বাজারে বিক্রি কমেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির অবনতির প্রভাব দেশের রপ্তানি খাতে পড়ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, ইউরোপের অস্থিরতার প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানিকারী অন্য দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তেলের দাম, শীতকালে গ্যাসের চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ মনে করেন, কোনো দেশে অস্থিরতা দেখা দিলেই যে আমদানি কমবে, তা নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কী প্রভাব পড়বে, তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন। রপ্তানিকারকদের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে ইউরোপের অস্থিরতা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব ও ক্রেতাদের আচরণের ওপর। তবে বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এখন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

