রাজধানীতে সরকারি কর্মচারীদের আবাসনসংকট দূর করতে ২০০ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ঢাকার ধানমন্ডির জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে ১৩ তলা ভিতের ওপর তিনটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আগামী রবিবার সকাল ১০টায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের সভাপতি তারেক রহমান। সভায় এ প্রকল্পসহ মোট ১৫টি প্রকল্প উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সালের অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তিনটি ১৩ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে দুটি ভবনে প্রতি তলায় ছয়টি করে ইউনিট থাকবে। এসব ভবনে ১৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্য ভবনে প্রতি তলায় চারটি করে ইউনিটের ব্যবস্থা থাকবে। সব মিলিয়ে তিনটি ভবনে ১৮৪টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮৫০ বর্গফুট।
প্রকল্পের প্রধান নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভবনগুলোর কাঠামো নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুতায়ন ও গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি কর্মীদের আবাসন-সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য একটি ভবন ও কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থাও করা হবে।
এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও শোধনাগার নির্মাণে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনায় ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের অন্যান্য সরঞ্জামে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং ৯টি জেনারেটর কেনায় ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। লিফট স্থাপনের জন্যও ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া ৫৭৫ মিটার সীমানাপ্রাচীর, ফটক ও নিরাপত্তাকক্ষ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ১১ লাখ টাকা।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সরকারি কর্মচারীদের আবাসনসংকট দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে রাজধানীতে কর্মরত প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে সরকারি ফ্ল্যাট ছিল মাত্র ১৩ হাজার ৫২টি। তখন মোট কর্মীর মাত্র ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ আবাসন সুবিধা পেতেন।
২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২ লাখ ৫৩ হাজার ২০৫ জন। তাঁদের জন্য ফ্ল্যাটের চাহিদা ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৫০টি। অথচ বরাদ্দযোগ্য ফ্ল্যাটের সংখ্যা মাত্র ১৭ হাজার ৫০৩টি, যা মোট চাহিদার ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফলে চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে প্রায় ২ দশমিক ৪৪ একর জমিতে আধুনিক আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, প্রকল্পের জমিটি বর্তমানে ফাঁকা পড়ে রয়েছে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় জমিটি বেদখল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। আবাসন সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষার বিষয়টিও প্রকল্প গ্রহণের অন্যতম কারণ।
প্রকল্পটি যাচাই করতে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০২২ সালের দরতালিকা অনুসারে ব্যয় পুনরায় যাচাইসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কমিটির সুপারিশ অনুসারে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করা হয়েছে।
প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের চতুর্থ অধ্যায়ে নগরায়ণ ও আবাসন খাতের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ও সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য উন্নত ও মানসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এর ফলে তাঁদের কাছ থেকে আরও উন্নত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এ লক্ষ্যেই প্রকল্পটি একনেকের সভায় অনুমোদনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

