বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে ফৌজদারি তদন্তের পাশাপাশি দেওয়ানি আইনি পদক্ষেপ জোরদার করছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪২টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ রয়েছে। এ কাজে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো অনুসরণ করছে ‘সম্পদ উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়’ নীতি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। এ সময় একাধিক মামলা করা, আদালতের আদেশে সম্পদ জব্দ ও ক্রোক এবং বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে চিঠি পাঠানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
চলতি বছরের আগস্টে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে নতুন দুর্নীতি দমন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রমে আবার গতি আসে। এখন অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি—দুই পথে কার্যক্রম
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলা ও অনুসন্ধানের জন্য যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়। এসব তদন্তে দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, কর-শুল্ক ফাঁকি, ঋণ জালিয়াতি এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ফৌজদারি তদন্তের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের উৎস, অর্থপাচারের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্তের ভিত্তিতে আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দ, ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, দেওয়ানি আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বিদেশে স্থানান্তর করা অর্থ দিয়ে কেনা সম্পত্তি, ব্যবসায়িক স্বার্থ, বিনিয়োগ ও ব্যাংক হিসাবের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুই ধরনের কার্যক্রম পাশাপাশি চললে একদিকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের সম্ভাবনাও বাড়বে।
প্রথম ধাপে ছয়, পরের ধাপে আরও ৪২ গোষ্ঠী
প্রাথমিক পর্যায়ে এস আলম, বেক্সিমকো, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপকে বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের দেওয়ানি কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকগুলো এককভাবে কাজ না করে কনসোর্টিয়াম পদ্ধতিতে সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। ছয়টি কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
এ পর্যন্ত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ কাজে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে গোপনীয়তা চুক্তি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগসংক্রান্ত চিঠিতে সই হয়েছে। বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করার কাজ পরবর্তী ধাপে এগোনোর কথা রয়েছে।
এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থায়নে সম্পদ অনুসন্ধান ও আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি অংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রাথমিক ব্যয়ের চাপ কমতে পারে। তবে সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, মালিকানা যাচাই ও আইনি দাবি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
প্রথম ছয়টি গোষ্ঠীর বাইরে আরও ৪২টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রমের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণতথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিদেশে সম্পদ অনুসন্ধান ও আইনি পদক্ষেপের জন্য আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য সম্পদের অবস্থান হিসেবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ডসহ ১২টি দেশকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গ্র্যান্ট থর্নটন, বেকার ম্যাকেঞ্জি, পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার, ক্রোল, ইওয়াই ও ডেন্টনসের নাম রয়েছে।
সম্পদ পুনরুদ্ধারে টাস্কফোর্সের ভূমিকা
সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রম সমন্বয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স (এআরটিএফ) কাজ করছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এ টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, টাস্কফোর্সের কাজ হলো অবৈধ আর্থিক প্রবাহ শনাক্ত করা, পাচার হওয়া সম্পদের স্থানান্তর অনুসন্ধান করা এবং অর্থ ফেরানোর পথে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেসব দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা নিয়ে সম্পদ ফিরিয়ে আনাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
তবে বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য পেতে অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ কারণে সম্পদ শনাক্ত ও দেশে ফেরানোর কাজ দ্রুত শেষ করা কঠিন হতে পারে।
প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দের উদ্যোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আদালতের আদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা মূল্যের দেশি-বিদেশি সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে দেশে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিদেশে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
এসব সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ট্রাস্ট ও বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ তহবিল রয়েছে। তবে সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার আদেশ জারি হওয়া মানেই তা দেশে ফেরত এসেছে, এমন নয়। বিদেশে থাকা সম্পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সম্পদ পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলায় আদালতের রায় হয়েছে। মামলাগুলোতে ৭৬২ জনের বেশি সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে পালানো বা সম্পদ সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে ১৫৮ জনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির জন্য আদালতের আদেশ নেওয়া হয়েছে।
দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানান, যৌথ তদন্ত দলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। কোনো মামলা বা অনুসন্ধানের কার্যক্রম বন্ধ নেই। ফৌজদারি তদন্তের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায়ে দেওয়ানি কার্যক্রমকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা
বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও ফেরত আনতে ১৬টি বিচারব্যবস্থার কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।
এ ছাড়া সম্পদ অনুসন্ধান, আর্থিক লেনদেনের বিশ্লেষণ এবং বিদেশি বিচারব্যবস্থায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগ, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও আর্থিক মূল্য শনাক্ত করছে। সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা অবরুদ্ধ বা জব্দ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে আদালতের নির্দেশে সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ এখন তদন্ত, দেওয়ানি মামলা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তবে সম্পদ শনাক্ত করা থেকে শুরু করে আদালতের মাধ্যমে তা উদ্ধার এবং অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই আইনি জটিলতা ও সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।

