স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে বড় করে তুলে ধরতে গিয়ে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, জ্বালানির নিরাপত্তা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৌশলগত মজুত এবং বিনিয়োগের পথে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর মতো বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। প্রস্তুতির এই ঘাটতির কারণেই সরকার উত্তরণের নির্ধারিত সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকায় ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের গতিপথ: গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মন্ত্রী বলেন, উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা করতে গিয়ে এর অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এখন সরকার যে অতিরিক্ত সময় চাইছে, তার উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি জোরদার করা।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬। সরকার এই সময়সীমা তিন বছর বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার আবেদন জানিয়েছে। তবে সময় বাড়ানোর আবেদন এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, অক্টোবরের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত আগামী সপ্তাহে আসতে পারে, আর কোনো কারণে দেরি হলেও মাস শেষ হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদও বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠিয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি বাড়তি সময় দেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে, তবে এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে।
প্রস্তুতির ঘাটতি বোঝাতে মন্ত্রী বিশেষভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত মজুতের অভাব এবং বিনিয়োগে আমলাতান্ত্রিক বাধার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আমদানি করা গ্যাসের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেশি, অথচ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বা দাম বেড়ে গেলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। একইভাবে সয়াবিন তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত না থাকলে সরবরাহে ধাক্কা লাগার সময় বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ শুধু বিদেশে পণ্য বিক্রির সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের ভেতরে উৎপাদন, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও এতে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসা শুরু করার দীর্ঘ প্রক্রিয়াকেও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালুর প্রক্রিয়া শুরু করা থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ এবং যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লেগে যায়। এত দীর্ঘ সময় ও একাধিক দপ্তরের অনুমোদন বিনিয়োগকারীদের খরচ বাড়ায় এবং নতুন শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করে। এ পরিস্থিতি বদলাতে অনলাইনে বাণিজ্য লাইসেন্স প্রদান, কোম্পানি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো এবং বিভিন্ন সংস্থার পরিদর্শন সমন্বিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু কাগজপত্রের ঝামেলা কমানো নয়, বরং বিনিয়োগ শুরু থেকে উৎপাদনে যাওয়া পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনা।
বাড়তি সময় পাওয়া গেলে সেটি কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ভাগ করে নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ওমান, সিঙ্গাপুর ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা অথবা প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে। বাংলাদেশের রপ্তানির অন্যতম প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ উত্তরণের আগেই সম্পন্ন করার লক্ষ্য জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি প্লাস) সুবিধা পাওয়ার বিষয়েও কাজ করার কথা বলেছেন। তবে এফটিএ নিয়ে প্রথম কারিগরি আলোচনার তারিখ তখনো নির্ধারিত হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে উত্তরণের আগেই চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়টি এখনো সরকারের লক্ষ্য, চূড়ান্ত অগ্রগতি নয়।
এখানে ইউরোপীয় বাজারের সুবিধা নিয়ে একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি থেকে উত্তরণ মানেই ২৪ নভেম্বরের পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান সব বাণিজ্যসুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ নতুন ব্যবস্থায় অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা ইবিএ সুবিধা পেতে থাকবে। একই সঙ্গে জিএসপি প্লাসের জন্য আবেদন করার সুযোগও রয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে প্রস্তুতির জন্য যে অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে, তার পাশাপাশি ইউরোপীয় বাজারে সুবিধা ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে। তবে কোন ব্যবস্থায় কত দিন এবং কী শর্তে সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নিয়ম ও চুক্তির ওপর।
এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু মর্যাদাগত এই পরিবর্তনের পাশাপাশি রপ্তানি প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার খরচের মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান না হলে নতুন অবস্থানের সুফল ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই প্রস্তুতির ঘাটতিই সামনে এসেছে। এখন বাড়তি সময় পাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সময়টি কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। সংস্কার, বাজার সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের বাধা কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলে তিন বছর বাড়তি সময়ও প্রত্যাশিত ফল নিশ্চিত করতে পারবে না।

