বাংলাদেশের প্রথম সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিতে কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) যোগ করে সরকারকে অতিরিক্ত ৩১ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের মুখে ফেলা হচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, এসব খরচ দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্যের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এসপিএম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তিমূল্য ১২৮ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫৯ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ২ শতাংশ।
ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান পিটি পেরতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল (পিটিকে) ১২৮ মিলিয়ন ডলারের সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর জমা দিয়ে কাজটি পায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবে ভ্যাট ও কর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে চুক্তির চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের সময় মূল্যায়ন কমিটি ওই অর্থকে কর ও ভ্যাটবিহীন হিসেবে বিবেচনা করে এর সঙ্গে প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলার যোগ করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দরপত্রের আমন্ত্রণপত্রের (আইটিটি) ২৭.৯ ধারায় বলা হয়েছিল, প্রযোজ্য কর, ভ্যাট, শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্যের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পিটিকেও তাদের দরপত্রের নথিতে জানিয়েছিল, তাদের প্রস্তাব আইটিটির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউএনবি এসব নথি পর্যালোচনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির সাধারণ শর্তের ১৮.১ ধারায় কর ও শুল্ক পরিশোধের দায়িত্ব ঠিকাদারের ওপর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ৬২.২ ধারায় বলা হয়েছে, চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে এসব খরচের কারণে চুক্তিমূল্য সমন্বয় করা যাবে না।
ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের ব্যক্তিদের মতে, দর মূল্যায়নের পর কর ও ভ্যাট যোগ করে চুক্তিমূল্য বাড়ানো এসব শর্তের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। এতে দরদাতার মূল প্রস্তাবের তুলনায় চুক্তির ব্যয়ও বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পিটিকের দরপ্রস্তাবের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ যোগ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) বিষয়ে একজন পরামর্শকের সুপারিশের ভিত্তিতে কর ও ভ্যাট যুক্ত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে তিনি রাজি হননি।
চুক্তির এই বিতর্কের মধ্যেই দেশের প্রথম এসপিএম স্থাপনাটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে চালু করা সম্ভব হয়নি। মূলত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হতে দেরি হয়েছে।
চীন পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি) নির্মিত প্রকল্পটি ২০২৪ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে বিপিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আগেই পরিচালনগত ত্রুটি সংশোধনের জন্য নির্ধারিত দায়বদ্ধতা ও গ্যারান্টির মেয়াদ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন টাকা। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সংশোধনের ফলে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৮২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ায় বলে বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ব্যয় বাড়লেও স্থাপনাটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ও কমিশনিং এখনো সফলভাবে সম্পন্ন হয়নি। একাধিকবার পরীক্ষামূলক পরিচালনা ব্যর্থ হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি বলে সূত্রের দাবি।
এসপিএম চালু না হওয়ায় সমুদ্রে নোঙর করা বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজের মাধ্যমে জ্বালানি তেল উপকূলের সংরক্ষণাগারে নেওয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে এ ধরনের জ্বালানি স্থানান্তরে প্রতি টনে প্রায় ৫ দশমিক ৫০ ডলার খরচ হয়। এ কাজে ব্যবহৃত ছোট জাহাজগুলোর বেশির ভাগই বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) পরিচালনাধীন।
প্রকল্পটির আওতায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণ করা হয়েছে, যার বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে গেছে। এতে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ছয়টি সংরক্ষণ ট্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল এবং ৯০ হাজার টন গ্যাস অয়েল সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ।
এসপিএম চালু হলে ১ লাখ ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংকার থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্বালানি খালাস করা সম্ভব হবে। বর্তমানে একই কাজে প্রায় ১১ দিন লাগে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, প্রকল্পটি চালু হলে জ্বালানি পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা খাতে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ ঘটনাকে সরকারি ক্রয়বিধি এবং দরপত্রের নির্দিষ্ট শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এসপিএম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো সেবা চুক্তিতে দরপত্রের শর্ত উপেক্ষা করে পরবর্তী সময়ে চুক্তিমূল্য বাড়ানোর নজিরবিহীন ঘটনা এটি। তাঁর মতে, দরপত্রের নথিতে এ ধরনের পরিবর্তন ঠেকানোর বিধান থাকার পরও চুক্তিমূল্য বাড়ানো হয়েছে।
উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় সরকার কখনো কখনো ভ্যাট মওকুফ করতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ ধরনের সেবা চুক্তিতে সেই বিবেচনার সুযোগ নেই, বিশেষত যখন দরপত্রেই কর ও ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত ছিল।
চুক্তি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ভেতরে কেউ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন কি না, কিংবা আন্তর্জাতিক ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে চুক্তিমূল্য বাড়ানো হয়েছে কি না—তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি জনসাধারণের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপানো বন্ধের পাশাপাশি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
প্রকল্পটির পরিচালন চুক্তির বাড়তি ব্যয় নিয়ে বিতর্কের ফলে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিপুল বিনিয়োগের পরও এসপিএমের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় প্রত্যাশিত সাশ্রয়ও এখনো অর্জিত হয়নি।

