বিশ্বজুড়ে খেলনার বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষের জন্য খেলনার চাহিদা বাড়ায় এ খাতে তৈরি হচ্ছে বিপুল রপ্তানি সম্ভাবনা। কিন্তু বিশাল এই বাজারে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। ২০২৫ সালে বিশ্বে খেলনা বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে। একই সময়ে চীন রপ্তানি করেছে ৩ হাজার ৪৮২ কোটি ডলারের খেলনা। বিপরীতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি ছিল মাত্র ৬ কোটি ২৯ লাখ ডলার।
বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি গত অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তারপরও গত চার বছর ধরে রপ্তানি আয় ৫ থেকে ৬ কোটি ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, কাঁচামাল আমদানির জটিলতা, নীতিসহায়তার ঘাটতি, পণ্যের বৈচিত্র্য ও মানোন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এ শিল্পের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্য
আন্তর্জাতিক খেলনাশিল্পের সংগঠন দ্য টয় অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে খেলনা বিক্রির পরিমাণ ছিল ১১০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা প্রায় ৩ শতাংশ বাড়ে। ২০২৫ সালে বিক্রি ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
খেলনা রপ্তানিতে চীনের অবস্থান শীর্ষে। ইউএন কমট্রেড ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটি ৩ হাজার ৪৮২ কোটি ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চেক রিপাবলিকের রপ্তানি ছিল ৪০২ কোটি ডলার। এ ছাড়া জার্মানি ২৩৫ কোটি, নেদারল্যান্ডস ১৬০ কোটি এবং মেক্সিকো ১৪২ কোটি ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে।
চেক রিপাবলিক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স ও হংকংও উল্লেখযোগ্য খেলনা রপ্তানিকারক। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নিচে।
৪১ দেশে রপ্তানি, আমদানিও বাড়ছে
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইতালি, চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪১টি দেশে খেলনা রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ইতালিতে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশীয় উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে খেলনা আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গত অর্থবছরে খেলনা আমদানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের ১ কোটি ১৩ লাখ ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি।
কাগজে-কলমে বাংলাদেশ থেকে ২৫টি প্রতিষ্ঠান খেলনা রপ্তানি করলেও নিয়মিত ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রপ্তানি করে ১৩ থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠান। শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারকের কারখানাগুলো বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ২১ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে হংকংভিত্তিক সনিক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সনিক (বাংলাদেশ) লিমিটেড। নীলফামারীর উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় অবস্থিত কারখানাটিতে ডাই-কাস্ট পদ্ধতিতে বিভিন্ন গাড়ির ক্ষুদ্র মডেল তৈরি করা হয়।
একই গ্রুপের দিনাজপুরের উইন চ্যাম্পিয়ন (বিডি) লিমিটেড প্রায় ৭৫ লাখ ডলার এবং বিপি ম্যানুফ্যাকচারিং (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড ৪৮ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক।
জার্মান-বাংলাদেশ বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত নরসিংদীর কাপকেক এক্সপোর্টস গত অর্থবছরে ৩১ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি কাপড়ের খেলনা তৈরি করে। অন্যদিকে, ঢাকা ইপিজেডে চীনা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা মেইগো (বাংলাদেশ) লিমিটেড রপ্তানি করেছে ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ডলারের ডাই-কাস্ট খেলনা।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা ও বাধা
দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বিদেশে খেলনা রপ্তানি করছে। গত অর্থবছরে তাদের ডিউরেবল প্লাস্টিক ও আরএফএল প্লাস্টিক প্রায় ১২ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ঝুনঝুনি, বল, পাজল, ব্লক, দোলনা, ট্রাইসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের খেলনা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, খেলনার বৈশ্বিক চাহিদা রয়েছে এবং শিশুদের সৃজনশীলতা ও শারীরিক-মানসিক বিকাশে এসব পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এগিয়ে থাকা দেশগুলো নিয়মিত নতুন ধরনের খেলনা উদ্ভাবন করছে। বাংলাদেশেরও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও মান উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা থাকলে এ খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
দেশীয় প্রতিষ্ঠান আমান প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজ বর্তমানে শ্রীলঙ্কা ও ইতালিতে খেলনা রপ্তানি করছে। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ২ লাখ ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আমান উল্লাহ বলেন, খেলনা উৎপাদনের অধিকাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় উৎপাদনকারীদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাঁর মতে, বন্ড সুবিধা দেওয়া হলে আমদানির প্রক্রিয়া সহজ হবে। পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে ছোট উদ্যোক্তাদের সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তাও উৎপাদন ব্যাহত করছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন পর্যায়ে ১ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য নষ্ট হচ্ছে, যেখানে চীনে এ হার প্রায় ১ শতাংশ। আশির দশকে অন্যান্য শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার যেভাবে সহযোগিতা করেছিল, খেলনাশিল্পের ক্ষেত্রেও তেমন উদ্যোগ নেওয়া হলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
তৈরি পোশাকের মতো খেলনা উৎপাদনেও বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা ও নির্ধারিত মান অনুসরণ করতে হয়। ধাতু, কাঠ, প্লাস্টিক ও কাপড় দিয়ে তৈরি খেলনার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক খেলনা, পুতুল, মডেল, বোর্ড গেম, ধাঁধা ও শিক্ষামূলক উপকরণের বাজারও রয়েছে।
অনেক আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা পোশাকের পাশাপাশি খেলনা বিক্রি করে। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান রপ্তানি সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে খেলনার বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে কেবল উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। কাঁচামাল আমদানির জটিলতা কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, মান নিয়ন্ত্রণ, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের খেলনাশিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

