সমুদ্রসম্পদের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে টেকসই মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক চাষ, কাঁকড়া উৎপাদন, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ও সামুদ্রিক গবেষণাসহ বিভিন্ন খাতে নীতিগত উদ্যোগ জোরদার করছে সরকার। পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানেও বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত অবস্থান এবং সমৃদ্ধ সামুদ্রিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মাছ ধরা ও সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা গেলে সামুদ্রিক খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
এ লক্ষ্যে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সমুদ্রভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে একাধিক খসড়া নির্দেশিকা ও নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিকভাবে সমুদ্রসম্পদ আহরণের পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানিয়েছেন, শিথিল করা কাঠামোর আওতায় সমুদ্রের ২৬টি ব্লকেই অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, উপকূলীয় ভোলা ও ফেনীতে গ্যাসের মজুত পাওয়া যাওয়ায় সমুদ্রেও গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী।
২০২৪ সালের মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টের (পিএসসি) পরিবর্তে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ডে নতুন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সংশোধন, পাইপলাইন বিনিয়োগে সহায়তা এবং অনুসন্ধানে ব্যর্থ কূপের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। সমুদ্রের গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন মজুত পাওয়া গেলে তা দেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে।
সামুদ্রিক চাষ সম্প্রসারণে সরকার খসড়া জাতীয় মেরিকালচার নীতি তৈরি করেছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে সামুদ্রিক জলজ চাষকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদী, হ্রদ ও জলাভূমি থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন বেড়ে ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। এ পরিমাণ দেশের বার্ষিক প্রায় ৫০ লাখ টন চাহিদার চেয়ে বেশি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত নীতিমালায় সামুদ্রিক চাষ সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রতিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রচলিত উপকূলীয় মাছ আহরণের বাইরে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, জলজ চাষ ও অন্যান্য সমুদ্রভিত্তিক শিল্পের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া কাঁকড়ার উৎপাদন, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি উন্নয়নে ‘গাইডলাইনস অন সাসটেইনেবল ক্র্যাব প্রোডাকশন, হারভেস্টিং, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট–২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে সরকার। এতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, আহরণ-পরবর্তী ক্ষতি কমানো, শীতল সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে বাংলাদেশের পতাকাবাহী মাছ ধরার জাহাজ পরিচালনার জন্য ‘হাই সিজ ফিশিং গাইডলাইনস–২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এতে জাহাজের লাইসেন্স, মাছ ধরার কার্যক্রম, আহরণ করা মাছের তথ্য সংরক্ষণ, ট্রান্সশিপমেন্ট, পণ্যের উৎস অনুসরণ, নজরদারি, নাবিকদের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অবৈধ, অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা প্রতিরোধ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুসরণ নিশ্চিত করাও এসব নির্দেশিকার অন্যতম লক্ষ্য। তবে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য জাহাজ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিকভাবে মাছের মজুত মূল্যায়ন, মাছ ধরার সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত নজরদারি সম্পদ প্রয়োজন হবে।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কুয়াকাটা ও সালিমপুরে নতুন দুটি সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা গেজেটের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে দেশে ঘোষিত সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা সামুদ্রিক রিজার্ভের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে।
এসব এলাকার উদ্দেশ্য সামুদ্রিক আবাসস্থল রক্ষা এবং মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্ব বজায় রাখা। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি আয় ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলার।
সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা মাছের মজুত পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে আইন প্রয়োগ, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, টেকসই অর্থায়ন এবং উপকূলীয় মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ওপর।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্লু ইকোনমিবিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে একটি বিশেষায়িত ব্লু ইকোনমি গবেষণা তহবিলের জন্য।
মৎস্য ও জ্বালানির পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত ও পুনর্ব্যবহার, বন্দর ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং সমুদ্রভিত্তিক সেবাশিল্পেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
নৌপরিবহন, রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন এবং পায়রা বন্দরের কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি সম্প্রতি জানিয়েছেন, সরকার স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা করেছে। চলতি অর্থবছরে ৩০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে।
সমুদ্রভিত্তিক শিল্পের বিকাশে বন্দর ও উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে যোগাযোগ, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিগত পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। নির্ভরযোগ্য সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় প্রয়োজন।
মেরিকালচার, কাঁকড়া উৎপাদন ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার খসড়া নির্দেশিকার পাশাপাশি সামুদ্রিক সংরক্ষণ এবং গবেষণা তহবিলের উদ্যোগ ব্লু ইকোনমি বিকাশের একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি করছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে আইন প্রয়োগ জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন জরুরি। কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে সামুদ্রিক সম্পদ রপ্তানি আয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

