ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি, ব্যবসায়ীর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, এমনকি বাজারের দামের চাপও কিছুটা নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির ওপর। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম বারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতি (এমপিএস) প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি: ঘড়ি দ্রুত ঘুরছে, অর্থনীতি কি তাল মেলাচ্ছে
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রয়েছে। এতদিন এই ঘোষণা আসত ছয় মাসে একবার, এখন আসবে তিন মাস পরপর।পরিবর্তনটি ইতিবাচক, কারণ অর্থনীতির পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকা দরকার।
কিন্তু প্রশ্নটা সোজা: বিবৃতি বেশি বার দিলেই কি দাম কমে, ঋণ বাড়ে, বন্ধ কারখানার চাকা ঘোরে? উত্তরটা শুধু ঘোষণার ঘনত্বে নেই, বরং ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে।
এক মাসে উল্টে গেল সিদ্ধান্ত, তাহলে আসল সিদ্ধান্ত কোথায়
৩০ জুন ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে সুদহার ১০ শতাংশেই রাখার কথা বলা হয়েছিল, অথচ ঠিক এক মাস পর, ৩০ জুলাই, মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) বৈঠকে সেটা কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করা হয়। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয় ২ আগস্ট থেকে।
এরপর এমপিসির ১৪তম বৈঠকে, ২৩ সেপ্টেম্বর, হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়, আর সেটি জানানো হয় ৩০ সেপ্টেম্বরের এমপিএসে। এই সময়রেখা থেকে একটা বিষয় ধরা পড়ে। সুদহারের আসল সিদ্ধান্ত হয় এমপিসির বৈঠকে, আর এমপিএস হলো সেই সিদ্ধান্তের কারণ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ মানুষকে বোঝানোর মঞ্চ।
অর্থাৎ বিবৃতি ত্রৈমাসিক হলেই সিদ্ধান্ত ত্রৈমাসিক হয়ে যায় না। আবার ছয় মাসের ঘোষণার মাঝখানেও যে হার বদলানো সম্ভব, জুলাইয়ে সেটা দেখাই গেছে। তাই প্রশ্নটা শুধু কত ঘন ঘন বলা হচ্ছে তা নয়, কতটা পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে সেটাও।
মুদ্রানীতির সময়সীমা: বাংলাদেশ কতটা আন্তর্জাতিক ধারায়?
বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাসের চক্র ছেড়ে তিন মাসে এসেছে আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, তিন মাসের চক্র আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত, ভারত তো দুই মাস পরপর পর্যালোচনা করে। তবে এর চেয়ে ছোট চক্রে যাওয়া এখনই সম্ভব নয়, কারণ আমদানি রপ্তানির তথ্য প্রতি মাসেই পাওয়া গেলেও শিল্প উৎপাদনের মতো অনেক সূচকের তথ্য আসে অনেক দেরিতে।
ফেডারেল রিজার্ভ বছরে আটটি নির্ধারিত বৈঠক করে, আর তার চারটিতে নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রকাশ করে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের এমপিসিও বছরে আটটি বৈঠক করে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাই। তার মানে বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নেয় বছরে প্রায় আটবার, আর পূর্বাভাস হালনাগাদ করে মূলত ত্রৈমাসিক ছন্দে।
বাংলাদেশের এমপিএস তাই বার্তা ও পূর্বাভাসের দিক থেকে সেই ছন্দের কাছাকাছি গেছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত কত ঘন নেওয়া হবে তা নির্ভর করবে এমপিসি কত বার বসছে তার ওপর।
এখানে অর্থনীতির একটা পুরোনো সত্যও মনে রাখা দরকার। মিল্টন ফ্রিডম্যান বলেছিলেন, মুদ্রানীতির প্রভাব অর্থনীতিতে পৌঁছাতে সময় লাগে, আর সেই সময় দীর্ঘ ও অনিশ্চিত।
পূর্বাভাসের খাতায় কত নম্বর
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের মুদ্রানীতিতে ২০২৬ সালের জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮.৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্কলনে এই প্রবৃদ্ধি ৫.৫ শতাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। এই ব্যবধান বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরে।
অর্থাৎ লক্ষ্য আর বাস্তবের ফারাক প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্ট। এখনকার লক্ষ্য ডিসেম্বর নাগাদ ৬.৮ শতাংশ, আর সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রাও আগের মতোই রাখা হয়েছে। আগস্টের ৪.৭৫ শতাংশ থেকে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে হবে। এটা কঠিন, অসম্ভব নয়।
কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটা এখানেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তখনই ভরসা করে যখন আগের পূর্বাভাস কেন মেলেনি সেটা খোলাসা করা হয়।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো ফাহমিদা খাতুনও বলেছেন, পূর্বাভাস আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক হলে পরের বিবৃতিতে কারণ ব্যাখ্যা করা উচিত।
মাঝরাতে বাড়ল জ্বালানির দাম, সুদহার সেখানে কী করবে
একটা সহজ হিসাব দেখা যাক। সুদহার ৯.৫০ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশ, বিয়োগ করলে থাকে ১.১৬ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে প্রকৃত সুদহার আর নীতি অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সুদহার এমনভাবে সামলাতে হবে যাতে এর প্রকৃত হার ইতিবাচক থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরও এই ইতিবাচক প্রকৃত হারকেই নীতির কঠোর অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। বিবিএসের হিসাবে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ থেকে বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশ হয়েছে, আর সরকারের চলতি অর্থবছরের সর্বোচ্চ লক্ষ্য ৭.৫ শতাংশ। জুনে এটি ছিল ৯.১৬ শতাংশ, তাই কমার প্রবণতা আছে, কিন্তু পথটা এখনো অমসৃণ। বাড়ার পেছনের কারণটা সুদহারের হাতের নাগালের বাইরে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায়। সাবেক বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এর প্রভাব আগামী কিছুদিন পণ্যের দামে থাকতে পারে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মতো ব্যয়জনিত চাপ মুদ্রানীতির জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেও বলেছে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট মেটানো যাবে না।
সুদহার কমালেই কি ঋণ প্রবাহ বাড়ে?
সুদহার কমলে ব্যাংকঋণ সস্তা হওয়ার কথা। সস্তা ঋণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবেন, তাতে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়বে।
জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিন টাকা ঋণের এক টাকার বেশি আটকে আছে। এমন ব্যাংক সস্তা তহবিল পেলেও নতুন ঋণ দিতে দ্বিধা করে, কারণ ঝুঁকির ভয় থেকে যায়।
শুধু ব্যাংক খাতই নয়, বাইরের বাধাও রয়েছে। উচ্চ ঋণব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা ঋণ প্রবৃদ্ধিকে চেপে ধরেছে। অর্থাৎ ঋণ সস্তা হলেও বিনিয়োগের পরিবেশ ঠিক না থাকলে ব্যবসায়ীর ঋণের চাহিদা বাড়ে না।
এ কারণে সুদহারের পাশাপাশি অন্যান্য উদ্যোগও চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার কথা বলেছে, যার ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্প ইউনিট আবার চালুর জন্য। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ পরিষ্কার করতে ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট ২০২৬ বাস্তবায়ন এবং ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট চূড়ান্ত করার কাজও চলছে।
ত্রৈমাসিক এমপিএস: তিন পরীক্ষা, তিন ফল
কোনো মুদ্রানীতি কাঠামো কার্যকর কি না, তা তিনটি প্রশ্নে বিচার করা যায়: সিদ্ধান্ত কি সময়মতো হচ্ছে, বার্তা কি বিশ্বাসযোগ্য, আর সিদ্ধান্ত কি সত্যিই অর্থনীতির শিরায় পৌঁছাচ্ছে।
প্রথম পরীক্ষায় ত্রৈমাসিক চক্র কিছুটা এগিয়ে। জুলাই ও সেপ্টেম্বরের এমপিসি বৈঠক দেখায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি বুঝে কাজ করছে, আর নিয়মিত বিবৃতি জবাবদিহির চাপও বাড়ায়। তবে তথ্য আসে দেরিতে, এই সীমাবদ্ধতা গতিকে আটকে রেখেছে।
দ্বিতীয় পরীক্ষায় এখনো প্রমাণ বাকি, কারণ ঋণ প্রবৃদ্ধির আগের লক্ষ্য মেলেনি, আর নতুন বিবৃতি সেই ব্যর্থতার ব্যাখ্যা কতটা দেবে তা দেখার বিষয়।
তৃতীয় পরীক্ষায় ফল সবচেয়ে দুর্বল, কারণ খেলাপি ঋণ আর জ্বালানির মতো সরবরাহ সংকট সুদহারের নাগালের বাইরে। ন্যায্য বিচারে বলতে হবে, এটি মাত্র প্রথম ত্রৈমাসিক বিবৃতি, সামনে এর কাঠামোর কার্যকারিতা দেখতে হবে।
ত্রৈমাসিক হওয়াটা নিজে কোনো সমাধান নয়, একটা ভালো সরঞ্জাম মাত্র, কাজ নির্ভর করে সেটা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর।
তাই এমপিএস হাতে এলে শুধু সুদহারের সংখ্যাটা দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি ঋণ ৬.৮ শতাংশের লক্ষ্যের কাছে পৌঁছাল কি না, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের সীমা ছুঁতে পারল কি না, আর বিবৃতিতে আগের ব্যর্থতার কৈফিয়ত আছে কি না। ঘড়ির কাঁটা দ্রুত ঘুরলে সময় বদলায় না, বদলায় তখনই, যখন কাঁটার সঙ্গে কাজও এগোয়।
নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

