আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রমবর্ধমান টেকসই উৎপাদনসংক্রান্ত শর্ত পূরণে দেশের সব সদস্য পোশাক কারখানার জন্য পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনবিষয়ক (ESG) প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বর্তমানে সংগঠনটির প্রায় ২ হাজার ৫০০ সক্রিয় সদস্য কারখানার মধ্যে মাত্র ৩২৬টি ESG প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অর্থাৎ মোট সদস্যের প্রায় ১৩ শতাংশ এ প্রতিবেদন দিয়েছে, যা সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএর প্রধান কার্যালয়ে সংগঠনটির ESG ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা পূরণ এবং টেকসই পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে আরও নিয়মনীতি মেনে পরিচালিত ও তথ্যনির্ভর হতে হবে।
ESG প্রতিবেদন কার্যকর করতে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সঙ্গেও কাজ করবে বিজিএমইএ।
ঢাকায় ডেনমার্ক দূতাবাস, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’-এর সহযোগিতায় ড্যাশবোর্ডটি চালু করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ইউরোপীয় বাজারের শর্তে বাড়ছে গুরুত্ব
বিজিএমইএর ESG প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বে থাকা পরিচালক শেখ মুস্তাফিজ বলেন, ২০২৯ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সরবরাহ করা পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে ক্রেতাদের ESG-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ক্রেতারা এসব প্রতিবেদন সংগ্রহ করবেন। তাই এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও জানান, কারখানাগুলো প্রতিবছর ESG প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রতিদিন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। কারখানাগুলো বিজিএমইএর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে এবং সংগঠনটি তাদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।
তবে কবে থেকে সব সদস্য কারখানার জন্য এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে, সে বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি।
ESG প্রতিবেদন একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পরিচালনা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে। পরিবেশগত সূচকের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ব্যবহার, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, পানির ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পরিশোধন। সামাজিক সূচকে বিবেচনা করা হয় মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা, লিঙ্গসমতা ও শ্রমিক অধিকার। আর সুশাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ESG চর্চার উন্নতি হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ধরে রাখা, কর্মপরিবেশ উন্নত করা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। এ ছাড়া পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিজিএমইএ।
ছোট কারখানার জন্য বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রচলিত নিয়মনীতি মেনে চলার গণ্ডি পেরিয়ে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ক্ষেত্রে ‘ESG Data to Action’ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে সহায়ক হতে পারে।
তবে সীমিত সম্পদ ও সক্ষমতার কারণে বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোর জন্য ESG প্রতিবেদন তৈরি ও বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও ছোট কারখানাগুলোকে এ উদ্যোগের বাইরে না রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, শুধু কম খরচের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই উৎপাদন, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা জরুরি।
বিশ্ববাজারের চাহিদা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ESG ড্যাশবোর্ডের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

