ব্যয়বহুল আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বাজেট সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ অর্থ বিশেষ করে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সোমবার সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার উদ্যোগ জোরদার করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ম্যানিলাভিত্তিক এডিবির কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ইআরডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। এডিবির কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী।সরকার দুই থেকে তিনটি বার্ষিক কিস্তিতে পুরো অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে চাপ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। এ জন্য দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইআরডির আরেক কর্মকর্তা জানান, এডিবি পুরো ২০০ কোটি ডলার দিতে না পারলে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকসহ (এআইআইবি) অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সহ-অর্থায়নের জন্য যুক্ত করা হতে পারে।
তিনি বলেন, এডিবির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে সরকার। ব্যাংকটি এককভাবে পুরো অর্থ দিতে না পারলে বাজেট সহায়তার অর্থায়নে অন্য দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোগে নীতিভিত্তিক ঋণের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে এডিবি ইতিমধ্যে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে।
গত অক্টোবরের শুরুতে অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এডিবির আলোচনা হয়। বৈঠকে নীতিগত সংস্কার এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযুক্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সরকারি ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চায় সরকার। এতে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি না বাড়িয়েও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ এক বছরের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এ উদ্যোগ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচিও এ ধরনের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস ও আমদানি করা জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব হতে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয়ও হ্রাস পেতে পারে।
আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে উন্নয়ন অর্থায়নের চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে এডিবির প্রস্তাবিত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অর্থায়নের কাঠামো চূড়ান্ত করা এবং কোন খাতে কীভাবে অর্থ ব্যয় করা হবে, তা নির্ধারণ এখনো বাকি। বাজেট সহায়তা, নীতিগত সংস্কার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মধ্যে অর্থের বণ্টন কীভাবে হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।
এডিবির সঙ্গে আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তব উৎপাদন বৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে।

