দেশের অভ্যন্তরীণ বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে দুটি নতুন অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে।
কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। এতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। গ্যাস সংকটের মধ্যে এই উদ্যোগ দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনারই অংশ।
প্রকল্পের নাম ‘তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ (তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩) খনন’। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার এ তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়। ২৫ অক্টোবর সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় সভাপতিত্ব করবেন একনেকের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পেট্রোবাংলার অধীন কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে আসবে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
২০২৬ সালের ১৮ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক প্রস্তাবের ৬৩২ কোটি টাকা থেকে ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ব্যয় ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, নতুন কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। সঙ্গে কনডেনসেটও মিলবে। তাঁর ভাষ্য, কূপ দুটির গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে এবং ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যাবে। সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আরও গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে, যার ফলে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০ বছরে কূপ দুটি থেকে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। কোম্পানির বর্তমান ওয়েলহেড মূল্য অনুযায়ী এই গ্যাস ও কনডেনসেটের আনুমানিক মূল্য ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং কনডেনসেটের ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের দাম ধরলে একই সময়ে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
বিজিএফসিএল বর্তমানে তাদের ছয়টি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। কোম্পানির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র তিতাসে খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে সংগৃহীত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এই তথ্য বিশ্লেষণে বিজিএফসিএল চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে নিয়োগ দিয়েছিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ওই দুই ক্ষেত্রে ১৬টি নতুন কূপ ও সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে।
প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে কূপ খনন, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা হবে। ২০২৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলএনজি আমদানি কমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও শিল্পোন্নয়নে সহায়তা মিলবে।
স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের সরকারি পরিকল্পনার আওতায় তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানান, ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খনন করা হবে।
দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বর্তমান সরবরাহের তুলনায় ক্ষুদ্র অংশ। বিজিএফসিএলের দৈনিক সরবরাহ প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট, ফলে এই সংযোজন বাড়তি প্রায় ৬ শতাংশ। তবে ব্যয়ের তুলনায় আয়ের হিসাবে প্রকল্প লাভজনক বলে প্রস্তাবে ইঙ্গিত আছে। ওয়েলহেড মূল্যে ৩৩৯ কোটি টাকা হলেও ভোক্তা পর্যায়ের দামে ধরলে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের গ্যাস পাওয়া যাবে এবং এলএনজি আমদানি কমবে। এই সাশ্রয়ই প্রকল্পের মূল যুক্তি।
তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো খনন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং প্রত্যাশিত মজুতের বাস্তব প্রাপ্তির ওপর। অনুসন্ধানমূলক কূপে প্রত্যাশিত গ্যাস না-ও মিলতে পারে। ২০১০-১২ সালের জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা হওয়ায় সেই ভূতাত্ত্বিক তথ্য কতটা হালনাগাদ, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সব মিলিয়ে একনেকের অনুমোদন ও দ্রুত বাস্তবায়নই এখন নির্ধারণ করবে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়।

