গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে পানীয়ের অ্যালুমিনিয়াম ক্যান তৈরির কারখানা স্থাপনে ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান অ্যালু হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কারখানায় উৎপাদিত ক্যানের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বাস্তবায়িত হলে দেশে রপ্তানিমুখী ক্যান শিল্পের নতুন একটি ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউয়ান ডিংইয়ান জানান, কারখানায় বছরে ১০০ কোটি ক্যান উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার তুলনামূলক ছোট। তাই মোট উৎপাদনের বড় অংশ রপ্তানি করা হবে, আর বাকি ১০ শতাংশ সরবরাহ করা হবে স্থানীয় বাজারে।
প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০২৪ সালে। একই বছর কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে নিবন্ধন নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে কারখানার বেসমেন্ট নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী আট মাসের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করে উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। কারখানার জন্য প্রায় ১৩ একর জমি নেওয়া হয়েছে। উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি করা হবে চীন থেকে।
বর্তমানে বাংলাদেশে পানীয়ের ক্যান পুরোটাই আমদানি করতে হয়, যার জন্য ব্যয় হয় বৈদেশিক মুদ্রা। দেশে ক্যান উৎপাদন শুরু হলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগও তৈরি হবে। ডলার-সংকটের এই সময়ে বিষয়টি অর্থনীতির জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করে। তবে উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালও আমদানিনির্ভর হওয়ায় নিট সাশ্রয় কতটা হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন ও রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণের ওপর।
প্রকল্পের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গ্যাস সংযোগ। উৎপাদন শুরুর জন্য এটি এখনো অনিশ্চিত। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সহায়তা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমান জানান, গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন পাওয়া গেছে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং গ্যাসের চাহিদার তথ্যও নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে বলে তিনি জানান। তাঁর আশা, উৎপাদন শুরুর সময় নাগাদ প্রতিষ্ঠানটি গ্যাস সংযোগ পাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দেশের শিল্পখাতে গ্যাস–সংকট নতুন নয়। তাই সংযোগ কবে ও কী পরিমাণে মিলবে, তার ওপরই নির্ভর করবে কারখানার উৎপাদন সূচির বাস্তবতা।
বাংলাদেশের বাজারে এখন অ্যালুমিনিয়ামের ক্যানে বিভিন্ন কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক ও জুস বিক্রি হচ্ছে। মোজো, কোকা-কোলা, পেপসি, মিরিন্ডা, স্প্রাইট, পাওয়ার ও মাউন্টেন ডিউয়ের মতো ব্র্যান্ডের পানীয় ক্যানে মেলে। প্লাস্টিকের বোতলের বিকল্প হিসেবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও টেকসই প্যাকেজিংয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারেও ক্যানের চাহিদা বাড়ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পানীয়ের স্বাদ ও মান ধরে রাখা, প্যাকেজিংয়ের স্থায়িত্ব এবং পুনর্ব্যবহারের সুবিধার কারণে অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্যাকেজিং আরও আকর্ষণীয় ও ব্যবহারবান্ধব করতে উৎপাদকেরা নতুন প্রযুক্তিও ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে আছে অগমেন্টেড রিয়েলিটিনির্ভর নকশা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনে রং বদলায় এমন বিশেষ কালির ব্যবহার।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী পানীয়ের ক্যানের বাজারের আকার ছিল ৩ হাজার ৭৯ কোটি ডলার। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩ হাজার ২৮৭ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাজারটি ৫ হাজার ৫৪৭ কোটি ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। এ সময়ে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাজারের ৩৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ ছিল উত্তর আমেরিকার দখলে।
সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়। এতে একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও আমদানি সাশ্রয়ের পথ খুলছে। তবে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা গেলেই এই সম্ভাবনা বাস্তব রূপ পাবে।

