খেতে লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু সেই ফসল বিক্রি করেই উৎপাদন খরচ তোলা যাচ্ছে না। কোথাও চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে এক টাকায়, কোথাও পিসপ্রতি দাম মিলছে মাত্র কয়েক টাকা। স্টার নিউজের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার অনেক কৃষক লাউ চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন। কেউ পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন, কেউ আবার গাছ কেটে লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন।
আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। বীজ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অথচ এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা। উৎপাদন খরচের তুলনায় আয় এত কম যে শ্রমের মজুরিও উঠছে না। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত বাগান কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
দুলাল ইসলামের মতে, কয়েক হাজার লাউ বিক্রি করেও সংসারের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা বাজারে একই লাউ পিসপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি তাঁর। উৎপাদকের কাছ থেকে অল্প দামে ফসল কেনা হলেও সেই সুবিধা ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না—এমন অভিযোগও করছেন কৃষকেরা।
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার চাষি আনসারুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। অথচ লাউ বিক্রি করে পিসপ্রতি সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পাওয়া যাচ্ছে। লোকসানের আশঙ্কায় গত ১০ দিন ধরে তিনি বাগানের পরিচর্যাও বন্ধ রেখেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সলেমান আলী বলছেন, এবার এলাকায় লাউয়ের আবাদ ও ফলন—দুটিই বেশি হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ক্রেতা ও বাইরের বাজারে চাহিদা বাড়েনি। ফলে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ পড়েছে দামে। পচনশীল এই সবজি দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে কৃষকের হাতে তা ধরে রাখার সুযোগও সীমিত।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বছরে প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়। তবে এবার আটোয়ারীতে উৎপাদন কতটা বেড়েছে, কৃষকেরা গড়ে কত দামে লাউ বিক্রি করছেন এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় তাঁদের লোকসানের পরিমাণ কত—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
লাউয়ের এই দরপতন কৃষির একটি পরিচিত সমস্যাকেই সামনে এনেছে: ভালো ফলন হলেই কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না। উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও বিকল্প ক্রেতার ব্যবস্থা না থাকলে অতিরিক্ত ফসলই কৃষকের লোকসানের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আটোয়ারীর চাষিদের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ নয়, ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও জরুরি।

