দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম রোববার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে জানান, প্রকল্পটির দরপত্রের নথি তৈরির কাজ চলছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেবে। বাকি ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা আসবে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে। এই তহবিলের অর্থের সুদের হার হবে ২ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের জন্য এক বছরের অবকাশসহ মোট ১৬ বছর সময় পাওয়া যাবে।
প্রকল্পের আওতায় ৪৪২ মেগাওয়াট-শীর্ষ ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এর ফলে দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
রামপালের এই প্রকল্পের বিশেষ দিক হলো, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য আগে অধিগ্রহণ করা জমির একটি অংশ এবার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো হবে। ২০১২ সালে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। জমিটি দুটি অংশে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ৯১৫ দশমিক ৫০ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই কেন্দ্রটি জমির প্রথম অংশে অবস্থিত। অন্যদিকে, ৯১৮ দশমিক ৫০ একরের দ্বিতীয় অংশটি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রয়েছে। এই জমিতেই নির্মিত হবে নতুন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র।
প্রকল্পটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও সম্ভাব্য শুল্কও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক প্রস্তাবে ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা ছাড়া প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ৬ টাকা ধরা হয়েছিল। তবে প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ১৮ পয়সা। তুলনামূলকভাবে, ফেনীর সোনাগাজীতে প্রস্তাবিত ২২০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সম্ভাব্য শুল্ক ধরা হয়েছে ৮ টাকা ৮৭ পয়সা। সে হিসাবে রামপাল প্রকল্পের প্রস্তাবিত শুল্ক প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর খুলনা বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৯৭২ মেগাওয়াট। একই সময়ে ঢাকায় চাহিদা ছিল ৬ হাজার ১০৮ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪২৭ মেগাওয়াট। রামপাল সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৪৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এতে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ, সঞ্চালন এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার ওপর।
কেন্দ্রটিকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করতে নতুন ২৩০ কিলোভোল্টের সঞ্চালনব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। এটি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছাকাছি একটি উপকেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
প্রকল্পটির পরিবেশগত গুরুত্বও রয়েছে। কয়লা ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর জ্বালানিসংশ্লিষ্ট চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের প্রকল্প আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে।
বর্তমানে নিজস্ব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৯ হাজার ১৪৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অবদান ১ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা মিলতে পারে।
প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও সেগুলো স্থাপনের কাঠামো কেনায়। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ রূপান্তরক, নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় হবে ৭৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানির পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটিকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পটি অননুমোদিত প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
রামপালের ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা কার্যকর রাখা, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।

