বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতা, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময়মতো এসব অর্থ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাতের নির্ধারিত হিসাবে ২,৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ পড়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১২ অক্টোবর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানো ‘বাংলাদেশের বকেয়া ফেরতযোগ্য অর্থের হালনাগাদ প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০২৬’-এ এসব তথ্য উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থের একটি অংশ জরুরি জ্বালানি, খাদ্য ও সার আমদানির মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অব্যবহৃত অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়াকে কেবল জরুরি অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। যে প্রকল্প থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তার উন্নয়নগত গুরুত্ব এবং নতুন খাতে অর্থ ব্যয়ের সম্ভাব্য ফলাফলও বিবেচনা করতে হবে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলমান প্রকল্প এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা বিতরণ না হওয়া ঋণ থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ জরুরি প্রয়োজনে পুনর্বণ্টন করা হয়েছিল। এর মধ্যে জ্বালানি কেনার জন্য ৭১৩ মিলিয়ন ডলার এবং জরুরি খাদ্য ও সার আমদানির জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়।
বিভিন্ন হিসাবে আটকে আছে হাজার কোটি টাকা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কিছু নির্ধারিত হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত রয়েছে। কোনো কোনো হিসাবের অর্থ ছাড়ের সময়সীমা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, কিছু হিসাবের সময়সীমা আগামী চার মাসের মধ্যে শেষ হবে। আবার কিছু হিসাবে অন্তত ছয় মাস ধরে কোনো অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুধু বাংলাদেশি মুদ্রায় পরিচালিত হিসাবগুলোতেই বকেয়া ও নিষ্ক্রিয় অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৯১০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এসব হিসাবে কোথাও এক কোটি টাকারও কম, আবার কোথাও ৭০ কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থ পড়ে রয়েছে।
অযোগ্য ব্যয় কিংবা ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মসংক্রান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা অর্থের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই উন্নয়ন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জরুরি বহুমুখী সহায়তা, গ্রামীণ সেতু উন্নয়ন, প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধ খাতের উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প।
বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় অগ্রিম অর্থায়ন হিসাবেও ৩৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার অব্যবহৃত রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখনগত ঘাটতি পূরণের প্রকল্পেও ছয় মাস ধরে অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হওয়া প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সাতটি নির্ধারিত হিসাবে ফেরতযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত ১১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পড়ে রয়েছে। অন্য দুটি হিসাবে অর্থ ছাড়ের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও ৪১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অব্যবহৃত রয়েছে।
এ ছাড়া আগামী চার মাসের মধ্যে অর্থ ছাড়ের সময়সীমা শেষ হতে যাওয়া দুটি বড় প্রকল্পের হিসাবে আরও ১ হাজার ১০০ কোটি ৯১ লাখ টাকা পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিবরণ নির্ধারিত সময়ে জমা না দিলে এসব অর্থও বকেয়া হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কেন কাজে লাগানো যাচ্ছে না বৈদেশিক ঋণ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তব কাজ শুরু করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে ঋণের অর্থ পড়ে থাকে এবং প্রত্যাশিত উন্নয়ন সুফলও সময়মতো পাওয়া যায় না।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা এবং জমি অধিগ্রহণের জটিলতা অন্যতম প্রধান সমস্যা। জমি নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি বিরোধ, জটিল ক্রয়প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্ব এবং দরপত্র মূল্যায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দেয়।
এর সঙ্গে রয়েছে ফাইল নিষ্পত্তিতে ধীরগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং অভিজ্ঞ ও পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালকের ঘাটতি। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণেও কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া পাঁচ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার এই অঙ্গীকার ১৩ অক্টোবর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিজার্ডের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তুলে ধরে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদনের পর প্রথম দফায় ঋণের অর্থ ছাড় হতে গড়ে ১১ দশমিক ৮ মাস সময় লাগে। ফলে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই ঋণের শর্ত অনুযায়ী পাওয়া অবকাশকালীন সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পার হয়ে যেতে পারে।
সম্ভাব্যতা যাচাই ও অনুমোদনের আগের অন্যান্য প্রক্রিয়া যুক্ত হলে সময় আরও বাড়ে। প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত অর্থায়ন নিয়ে সমন্বয়ের অভাবও বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে অনেক প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু হতে কয়েক বছর লেগে যায়।
অর্থ কোথা থেকে নেওয়া হবে, কোথায় ব্যয় হবে
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, চলমান প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করা বিকল্প অর্থায়নের একটি সুযোগ হতে পারে। তবে নতুন খাতেও যদি একই ধরনের বাস্তবায়নগত সমস্যা থাকে, তাহলে অর্থ স্থানান্তর করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
তাঁর মতে, অর্থ কত দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে, শুধু সেটির ভিত্তিতে পুনর্বণ্টনের সাফল্য বিচার করা উচিত নয়। বরং অর্থ কোন প্রকল্প থেকে সরানো হচ্ছে, কোথায় ব্যয় করা হবে এবং এর মাধ্যমে কী ফল অর্জনের প্রত্যাশা রয়েছে, তা আগে মূল্যায়ন করতে হবে।
নতুন ঋণের ব্যবস্থা করার তুলনায় বিদ্যমান অর্থ পুনর্বণ্টন দ্রুত হতে পারে। কিন্তু যে প্রকল্প থেকে অর্থ সরানো হচ্ছে, সেটির কার্যকারিতা, ভবিষ্যৎ প্রয়োজন এবং উন্নয়নগত সুফলও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর হলেই সেখান থেকে অর্থ তুলে নেওয়া যুক্তিসংগত নয়। জরুরি প্রয়োজনে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ফলে মূল প্রকল্পটি পরে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজনেও পড়তে পারে।
জাহিদ হোসেনের মতে, বিকল্প খাতে অর্থ ব্যবহারের সম্ভাব্য সুফলকে মূল প্রকল্পের ক্ষতির সঙ্গে তুলনা করতে হবে। তা না হলে নতুন খাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না, আবার মূল প্রকল্পের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের লক্ষ্য দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা, আর বিশ্বব্যাংকেরও অর্থ ছাড় বাড়ানোর নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহ থাকতে পারে। কিন্তু এসব লক্ষ্য পূরণ হলেই যে দেশের উন্নয়নগত ফল ভালো হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
অর্থ পুনর্বণ্টনে সতর্কতার পরামর্শ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে অব্যবহৃত ঋণের অর্থ পুনর্বণ্টন বিকল্প অর্থায়নের একটি পথ হতে পারে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, যেসব প্রকল্পের কাজ চলমান, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এগোচ্ছে অথবা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব প্রকল্পের অর্থায়ন কমানো উচিত নয়।
বরং যেসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে কিন্তু অর্থ অব্যবহৃত রয়েছে, যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিংবা নির্ধারিত সময়সূচি থেকে অনেক পিছিয়ে আছে, সেসব প্রকল্পের অর্থ পুনর্বণ্টনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, সময়মতো এগিয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন সুরক্ষিত রাখার পর বিকল্প খোঁজা উচিত। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বরাদ্দ করা অর্থের মধ্যে পুনর্বণ্টনের সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
জরুরি চাহিদা মেটানো ও উন্নয়নের ভারসাম্য
অব্যবহৃত বৈদেশিক ঋণের অর্থ কাজে লাগানোর সুযোগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জ্বালানি, খাদ্য ও সার আমদানির মতো জরুরি চাহিদা পূরণে দ্রুত অর্থায়ন সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এর ফলে মূল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কাও থাকবে।
তাই অর্থ পুনর্বণ্টনের আগে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থের প্রকৃত প্রয়োজন, সম্ভাব্য সুফল এবং অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পরিণতি যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে নতুন খাতে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণের অর্থ অব্যবহৃত পড়ে থাকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে প্রকল্প পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণ, ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। অন্যথায় এক প্রকল্প থেকে সরিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করা অর্থও ভবিষ্যতে একইভাবে অব্যবহৃত পড়ে থাকার ঝুঁকিতে থাকবে।
উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থের সংস্থান যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ সময়মতো এবং সঠিক কাজে ব্যবহার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

