দেশে নতুন শিল্প স্থাপন, কারখানার সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের তিন ধাপের ‘থ্রি-আর’ কৌশলকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তবে তাঁদের মতে, শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন, ব্যাংক খাতের সংস্কার, সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের এই প্রত্যাশার বিপরীতে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। জুলাইয়ের শেষে এই পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে ২০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা।
একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুনে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
ব্যাংকে অর্থের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও নতুন শিল্প স্থাপন ও কারখানা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ সীমিত। ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানির ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল চাহিদার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছে।
কী এই ‘থ্রি-আর’ কৌশল
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ বাড়াতে তিন পর্যায়ের একটি কৌশল ঘোষণা করেছে। এর তিনটি ধাপ হলো পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পুনর্গঠন।
প্রথম পর্যায়ে এক বছরের মধ্যে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এক থেকে তিন বছরের মধ্যে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, মোট বিনিয়োগকে মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট দেশজ উৎপাদনে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অবদান ২ দশমিক ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এই কৌশলে বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের উন্নয়ন, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব লক্ষ্য অর্জনে নীতিগত ধারাবাহিকতা, করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ব্যাংকে অর্থ আছে, ঋণ চাহিদা বাড়ছে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩২ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি ছিল ২৬ লাখ ৩ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলেও তার বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে যাচ্ছে। কারণ, এসব বিনিয়োগ থেকে তুলনামূলক নিরাপদ আয় পাওয়া যায়।
আগস্টের শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্যসম্পদ ছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৮২ শতাংশ, অনুমোদিত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা ছিল।
বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল গঠন করে। একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও ঋণের চাহিদায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
উচ্চ সুদ ও কার্যকরী মূলধনের সংকটে উদ্যোক্তারা
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, উচ্চ ঋণসুদ, ঋণ পরিশোধের জন্য কম সময় এবং কার্যকরী মূলধনের সংকট দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার প্রায় ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিলম্বের কারণে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ার সময়সীমা ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করায় আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বাড়িয়েছে। কিন্তু একই অনুপাতে কার্যকরী মূলধন বাড়েনি।
পারভেজ উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধন যখন ৫০ কোটি টাকা ছিল, তখন ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা। এখন ডলারের দাম ১২২ টাকা হলেও প্রতিষ্ঠানের মূলধন একই রয়েছে। ফলে আগের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে এখন কম কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
তিনি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ও ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ম বাস্তবসম্মতভাবে সমন্বয়, কার্যকরী মূলধনের ঋণ বাড়ানো এবং ঋণের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, প্রণোদনা তহবিল, ঋণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অর্থায়নপ্রাপ্তি সহজ করা গেলে উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়তে পারে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ, কারখানা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিনিয়োগে আশাবাদী, তবে সতর্ক নিটওয়্যার খাত
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, ‘থ্রি-আর’ কৌশল, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরতে পারে।
তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণ এবং দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধান করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ ও ঋণপ্রাপ্তির বাধা দূর না হলে নতুন বিনিয়োগের গতি বাড়ানো কঠিন হবে।
উৎপাদনশীল খাতে অর্থ প্রবাহ বাড়ানোর পরামর্শ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, করনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অগ্রিম কর ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া উন্নত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ঋণের সুদ ও পরিশোধের শর্ত ব্যবসাবান্ধব করা এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে ব্যাংকে পড়ে থাকা অতিরিক্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এতে নতুন শিল্প স্থাপন, কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়বে। অন্যথায় ব্যাংক খাতে বিপুল তারল্য থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগে গতি ফেরানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, শিগগিরই ঋণের চাহিদা বাড়বে।
শুধু সুদহার কমিয়ে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরবে না
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, শুধু সুদহার বা সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যথেষ্ট নয়। এ জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও জরুরি।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকগুলো আয় করেছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের মূল ব্যবসা—আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ—গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তাঁর মতে, ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় কমে যাওয়া পুরো খাতের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা
সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশল অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কিন্তু ব্যাংকে বিপুল তারল্য থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে অনাগ্রহী হলে এবং উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
এ কারণে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত ঘোষণার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সংস্কার, ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা, দ্রুত কর ফেরত, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ‘থ্রি-আর’ কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ কতটা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যাচ্ছে, নতুন শিল্প কতটা গড়ে উঠছে এবং দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি কতটা বাড়ছে, তার ওপর।

