মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসে, কিন্তু বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-পানির বিল ও অন্যান্য খরচ মেটাতে না মেটাতেই টাকার বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। মাসের শেষ সপ্তাহে এসে অনেক চাকরিজীবীকে হিসাব মেলাতে হয় নতুন করে। কারও সঞ্চয় ভাঙতে হয়, কেউ পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার নেন, আবার কেউ মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা থেকে ঋণ নিয়ে বাকি দিনগুলো পার করেন।
রাজধানীর অনেক বেতনভোগী মানুষের কাছে এ অভিজ্ঞতা এখন পরিচিত। আয় বাড়ার গতি যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন নিয়মিত চাকরি থাকা সত্ত্বেও আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু মাসিক বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকে না; সঞ্চয়, পুষ্টি, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও সংকুচিত হতে থাকে।
বেতনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় খরচে
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আনাস আহমেদের মাসিক বেতন ৫৪ হাজার টাকা। পরিবারের সঙ্গে থাকলেও তাঁকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া দিতে হয়। গ্যাসের সিলিন্ডার, পানি ও বিদ্যুতের বিল মিলে খরচ হয় আরও ৫ হাজার টাকা। ছয় মাস আগে কেনা একটি আইফোনের কিস্তি বাবদ প্রতি মাসে দিতে হয় ৫ হাজার ৫০০ টাকা।
কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য তিনি সাধারণত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। জ্বালানি ও যাতায়াত বাবদ মাসে ব্যয় হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। বাজারের জন্য খরচ হয় আরও ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে এসব খাতেই তাঁর মাসিক বেতনের সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা চলে যায়। পরিবারের অন্য প্রয়োজন, চিকিৎসা কিংবা হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো ব্যয় মেটানোর জন্য তখন হাতে খুব বেশি অর্থ থাকে না।
আনাস প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা সঞ্চয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়মিত খরচের চাপ সামলাতে গিয়ে প্রায়ই সেই সঞ্চয় ভাঙতে হয়। অনেক সময় মাসের ২৫ তারিখের মধ্যেই তাঁর হাতে টাকা ফুরিয়ে যায়। তখন বাকি দিনগুলো চালাতে মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেন। এসব ঋণের মেয়াদ তিন মাস এবং এর সঙ্গে সুদও দিতে হয়। পরের মাসে বেতন পাওয়ার পর ঋণ শোধ করতে গিয়ে আবারও বাজেটে চাপ পড়ে।
আনাসের ভাষায়, প্রতিদিনের খরচ বাড়লেও বেতন সেই অনুপাতে বাড়ছে না। বছরে প্রতিষ্ঠান থেকে ২ থেকে ৪ হাজার টাকা বেতন বাড়লেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলানোর জন্য তা যথেষ্ট হচ্ছে না।
আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী নিলয়ের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাঁর মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করার কথা ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে অতিরিক্ত কাজ খুঁজে পাওয়াও সহজ হচ্ছে না।
এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে। নিয়মিত আয় থাকলেই যে একটি পরিবার আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকবে, তা নয়। প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর পর্যাপ্ত অর্থ হাতে না থাকলে সামান্য অপ্রত্যাশিত ব্যয়ও ঋণের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ায় চাপ, কমছে না পণ্যের দাম
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আগের ১২ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর আগের ১২ মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়া মানেই পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। মূল্যস্ফীতির হার কমলে সাধারণত দাম বাড়ার গতি কমে; আগে যে দামে পণ্য কেনা যেত, সেই দামে আবার ফিরে আসার নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে পরিবারগুলোকে আগের তুলনায় বেশি খরচ করেই দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হয়।
আনাসের মতো বেতনভোগীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও স্পষ্ট। বাড়িভাড়া, জ্বালানি, খাবার ও যাতায়াতের খরচ নিয়মিত দিতে হয়। এসব ব্যয় সহজে কমানো যায় না। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে গিয়ে সঞ্চয় কমে যায় এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
মজুরি বৃদ্ধির হারও পিছিয়ে
পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে আয় কতটা তাল মেলাতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ একই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় ০ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল।
এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, গড়ে মজুরি বৃদ্ধির গতি পণ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক কর্মীর আয় বা ক্রয়ক্ষমতা একই হারে কমেছে। ব্যক্তিভেদে বেতন বৃদ্ধি, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং খরচের ধরন আলাদা।
তবু যেসব কর্মীর বেতন সামান্য বাড়ছে অথচ বাড়িভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, তাঁদের বাস্তব আর্থিক চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাগজে বেতন বাড়লেও সেই অর্থ দিয়ে আগের সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা না গেলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি হয় না।
মূল্যস্ফীতির পেছনে নীতিগত চ্যালেঞ্জ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্কের সম্মানসূচক গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বুঝতে হলে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সিদ্ধান্তগুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি যথেষ্ট কঠোরভাবে বা সঠিক সময়ে প্রয়োগ করা হয়নি। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ধারাবাহিক তারল্য সহায়তা এবং সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতিও মূল্যস্ফীতির চাপে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।
দুর্বল কর আদায়ব্যবস্থা ও বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল ব্যয় সরকারের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে বলেও তাঁর মত। এসব কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলা না করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এখানে নীতিনির্ধারণের একটি বড় প্রশ্ন হলো, অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং তার সুফল সাধারণ পরিবারের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে।
সংসারের খরচ কমাতে গিয়ে পুষ্টি ও শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত
মূল্যস্ফীতির প্রভাব সব পরিবারের ওপর সমান নয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর আয়ের বড় অংশ খাবার, বাসস্থান ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়। তাই দাম বাড়লে তাদের হাতে খরচ কমানোর সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
মাহতাব উদ্দিনের মতে, পণ্যের দাম বাড়লেও প্রকৃত মজুরি সেই অনুপাতে না বাড়লে পরিবারগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কেউ মাছ, মাংস বা ফল কেনা কমিয়ে দিতে পারেন, কেউ কম পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এমনকি সন্তানের শিক্ষার খরচও কমিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব তাৎক্ষণিক বাজেটের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। পুষ্টির ঘাটতি, শিক্ষায় ব্যাঘাত এবং ভবিষ্যতে আর্থিক অবস্থার উন্নতির সুযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
যে পরিবার আগে থেকেই আয়ের প্রায় পুরোটা প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে, তাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থ সঞ্চয় করা কঠিন। তাই মূল্যস্ফীতির চাপকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যয়ের অভ্যাস দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার বড় অংশ অদেখা থেকে যায়।
ধার করে মাস চালানো, পরের মাসেও একই সংকট
জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর চাপ শুধু চাকরিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরাও দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ মোটরসাইকেলে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন অন্তত ২০০ টাকা জ্বালানি খরচ করেন। অন্যদিকে মেট্রোরেলে যাওয়া-আসায় তাঁর ব্যয় হয় ২৪০ টাকা। ফলে যাতায়াতের মাধ্যম বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে খরচের হিসাব করতে হয়।
মাহমুদ প্রায়ই বন্ধুদের কাছ থেকে শোনেন, মাসের শেষ দিকে তাঁদের টাকা ধার করতে হয়। বেতন পাওয়ার পর সেই টাকা শোধ করলেও পরের মাসে আবার সংকট তৈরি হয়। তখন নতুন করে ঋণ নিতে হয়।
এভাবে এক মাসের ঘাটতি পরের মাসের বাজেটেও চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ঋণের সঙ্গে সুদ যুক্ত হলে ভবিষ্যতের আয় থেকে আরও বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর জন্য হাতে থাকা অর্থ আরও কমে যেতে পারে।
এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন, যদি আয়ের তুলনায় প্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়মিত বেশি থাকে। ঋণ নেওয়া তখন সাময়িক স্বস্তি দিলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।
কর্মীদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ
মাহতাব উদ্দিন মনে করেন, শ্রমিকদের সম্মিলিত দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধির দাবি জানানো অনেকের জন্য কঠিন।
তিনি যুক্তরাজ্যে শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেলকর্মীদের সংগঠিতভাবে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে অনেক কর্মী, এমনকি দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও একই ধরনের দর-কষাকষির সুযোগ পান না। শ্রমবাজারে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে কর্মীদের পক্ষে বেতন বৃদ্ধির দাবি প্রতিষ্ঠা করা আরও কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত ব্যয়ের ধরনও মাসিক বাজেটকে প্রভাবিত করে। রেস্তোরাঁয় খাওয়া, ঘোরাঘুরি, অনলাইনে কেনাকাটা বা ছোটখাটো শখের পেছনে নিয়মিত অর্থ ব্যয় হলে মাস শেষে তার সম্মিলিত পরিমাণ বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিদিন মাত্র ১০০ টাকা খরচ হলেও মাসে তা ৩ হাজার টাকায় পৌঁছায়। তাই ব্যয়ের হিসাব রাখা ও কোথায় কমানো সম্ভব তা চিহ্নিত করা উপকারী। তবে এটিকে সবার সমস্যার একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। যাদের খাবার, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের খরচেই প্রায় পুরো আয় শেষ হয়ে যায়, তাঁদের জন্য বাড়তি ব্যয় কমানোর সুযোগ খুবই সীমিত।
চাকরির সংকট আয় বাড়ানোর পথও সংকুচিত করছে
বাড়তি আয়ের সুযোগ খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্য সহজ নয়। চাকরির পাশাপাশি অন্য কাজ করতে চাইলে সময়, দক্ষতা ও উপযুক্ত সুযোগের প্রয়োজন হয়। সব কর্মীর পক্ষে এসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয় না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বাংলাদেশে মোট শ্রমের চাহিদা ২ শতাংশের সমপরিমাণ চাপের মুখে পড়তে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি, অন্যদিকে বিদ্যমান কর্মীদের আয় ও দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকলে এবং উপযুক্ত চাকরির সুযোগ সীমিত থাকলে অনেক পরিবারের পক্ষে আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাজেট ও সঞ্চয় সহায়ক, কিন্তু সব সমস্যার সমাধান নয়
ঢাকার সাংবাদিক মুমিতুল মিম্মা নিজের ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখার মাধ্যমে আর্থিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছেন। আগে তিনি খরচের হিসাব না রাখায় মাসের মাঝামাঝি সময়েই টাকার সংকটে পড়তেন। পরে যাতায়াতের ভাড়া থেকে শুরু করে এক কাপ চায়ের খরচ পর্যন্ত লিখে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলেন। এতে টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে তা বোঝা এবং খরচ পরিকল্পনা করা সহজ হয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যয়ের হিসাব রাখা অপ্রয়োজনীয় খরচ চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। একইভাবে বেতন পাওয়ার পর সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা আলাদা করে রাখা, আলাদা সঞ্চয়ী হিসাব ব্যবহার করা এবং জরুরি প্রয়োজনে অর্থ জমিয়ে রাখার অভ্যাসও কাজে আসতে পারে।
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মঞ্জুরা আক্তারও প্রয়োজনীয় খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট তৈরি এবং মাসের শুরু থেকেই সঞ্চয়ের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প বা পেনশনভিত্তিক আমানত প্রকল্পে নিয়মিত অর্থ জমা রাখলে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে। জরুরি প্রয়োজনের জন্য আলাদা তহবিল থাকলেও হঠাৎ ব্যয়ের সময় ঋণের প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনারও সীমা রয়েছে। আয় দিয়ে যদি মৌলিক প্রয়োজনই মেটানো না যায়, তাহলে সঞ্চয় করা বাস্তবে অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু খরচের হিসাব রাখার পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না।
সংকটের সমাধানে আয় ও ব্যয়—দুই দিকেই নজর দরকার
চাকরিজীবীদের আর্থিক চাপের পেছনে ব্যক্তিগত ব্যয়ের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের ব্যয়, সীমিত কর্মসংস্থান এবং ঋণের খরচও ভূমিকা রাখছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাস্তবসম্মত বাজেট, নিয়মিত ব্যয়ের হিসাব এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয় সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর অর্থনৈতিক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মজুরি ও উৎপাদনশীলতার উন্নতি এবং কার্যকর আর্থিক নীতির প্রয়োজন রয়েছে।
সব পরিবারের ব্যয়ের ধরন এক নয়। তাই সবার জন্য একই সঞ্চয় লক্ষ্যমাত্রা বা একই ব্যয় কমানোর পরামর্শ কার্যকর হবে না। যাঁদের আয় তুলনামূলক বেশি, তাঁদের জন্য সঞ্চয়ের সুযোগ থাকতে পারে; অন্যদিকে যাঁদের আয় প্রায় পুরোটাই মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে আয় বাড়ানো ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ কমানোই বেশি জরুরি।
শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্বস্তি শুধু মাসিক বাজেটের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। আয় দিয়ে প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা, ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ জমাতে পারা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ঋণের ওপর নির্ভর না করেও টিকে থাকার সুযোগ—এই তিনটি বিষয়ই একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

