বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি বাড়লেও বাস্তবে অর্থছাড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে, ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ের বৈদেশিক সহায়তাবিষয়ক সাময়িক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশকে ৫৪১ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ ছাড় করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৮ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার।
ঋণের পাশাপাশি অনুদানসহ মোট বিদেশি সহায়তার অর্থছাড়ও কমেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৬৬২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ১ হাজার ১৪৮ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার।
প্রতিশ্রুতি বাড়লেও অর্থ আসছে কম
বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় কমলেও নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৯১০ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে ঋণের প্রতিশ্রুতি বেড়ে ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮২১ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার। অনুদানের প্রতিশ্রুতিও ৮৮ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১২৫ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগীরা নতুন অর্থায়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও সেই অর্থ বাস্তবে ছাড় হওয়ার গতি একই রকম নেই। প্রতিশ্রুতি থেকে অর্থছাড়ের এই ব্যবধান প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থায়নের শর্ত পূরণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য দুই সময়েই বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতির পুরোটা ছিল প্রকল্প সহায়তা। কোনো সময়েই নতুন খাদ্যসহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
প্রকল্প সহায়তার অর্থছাড়েও পতন
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে মোট ৬৫২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের এই অর্থের মধ্যে ৫৪১ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার ছিল ঋণ এবং ১১০ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলার অনুদান।
অন্যদিকে খাদ্যসহায়তার অর্থছাড় দুই সময়েই ১০ মিলিয়ন ডলারে অপরিবর্তিত ছিল। পুরো অর্থই ছিল অনুদান।
প্রকল্প সহায়তার অর্থছাড় কমে যাওয়ায় বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থপ্রাপ্তির সময় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে শুধু অর্থছাড়ের পরিমাণ দিয়ে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নির্ধারণ করা যায় না; প্রকল্পের ধরন, অর্থছাড়ের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট শর্তও বিবেচনা করতে হয়।
বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ বেড়েছে
একদিকে নতুন ঋণের অর্থছাড় কমেছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধে বাংলাদেশের ব্যয় বেড়েছে। ইআরডির সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়ে ৮৫৮ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৮১৬ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে সুদ পরিশোধ বেড়ে ৪৯২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৪৬২ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ১৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা।
এর মধ্যে আসল পরিশোধ হয়েছে ১০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা এবং সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৬২ কোটি টাকা।
অর্থায়নের ব্যবধান কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া এবং সেই অর্থ হাতে আসার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকতেই পারে। অর্থ ছাড় সাধারণত প্রকল্পের অগ্রগতি, নির্ধারিত শর্ত পূরণ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং অর্থায়ন চুক্তির বিধান অনুযায়ী হয়।
তবে প্রতিশ্রুতির তুলনায় অর্থছাড় কমে গেলে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ বাড়লে সরকারের বৈদেশিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন হয়।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কত নতুন ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, তা নয়। বরং প্রতিশ্রুত অর্থ কত দ্রুত ছাড় হচ্ছে, সেই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল প্রকল্পে ব্যবহার হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী থাকছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে নজর থাকবে অর্থছাড় ও ঋণ ব্যবস্থাপনায়
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বিদেশি সহায়তার নতুন প্রতিশ্রুতি বাড়লেও অর্থছাড়ের গতি কমেছে। পাশাপাশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয়ও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থছাড়ের সমন্বয় বাড়ানো, প্রয়োজনীয় শর্ত সময়মতো পূরণ করা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবহার আরও কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধের দায় সতর্কভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, ঋণের প্রতিশ্রুতি নিজে কোনো উন্নয়ন সুফল নিশ্চিত করে না। সেই অর্থ সময়মতো ছাড়, সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই ফল অর্জনের মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত মূল্য তৈরি হয়।

