নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে শুধু জরিমানা নয়, কর ছাড় হারানো থেকে শুরু করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো রাষ্ট্রীয় পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এমনকি কিছু চাকরিজীবীর বেতন-ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই করযোগ্য আয় থাকা কিংবা আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক—এমন ব্যক্তিদের সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
দেশে বর্তমানে সোয়া এক কোটি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বছরে প্রায় ৫০ লাখ করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দেন। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ লাখ টিআইএনধারী নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে টিআইএন থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই নিয়মে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না। করযোগ্য আয় থাকা এবং আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের শর্তসহ সংশ্লিষ্ট বিধান বিবেচনা করতে হয়। নির্ধারিত ৪৫ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা নিতে অনেক ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার প্রমাণও প্রয়োজন হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের ধারণা, করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়ম না মানলে তাঁদের কী ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হতে পারে, তা জানা জরুরি।
১. সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে আয়কর আইনের ২৬৬ ধারা অনুযায়ী কর কর্মকর্তারা জরিমানা আরোপ করতে পারেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিধান অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করা করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা হতে পারে। তবে জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ ১ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা।
রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য আরও ৫০ টাকা হারে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। কোনো তদন্তের প্রয়োজনে করসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হলে তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রেও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
অর্থাৎ রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে একদিকে আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে, অন্যদিকে বিলম্ব দীর্ঘ হলে অতিরিক্ত দায়ও তৈরি হতে পারে।
২. হারাতে পারেন কর ছাড়ের সুবিধা
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে কর অব্যাহতি ও কর ছাড়ের কিছু সুবিধা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
আয়কর আইনের ১৭৪ ধারার আওতায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে কর ছাড়ের সুবিধা সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, সঞ্চয়পত্রসহ সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে কেউ কর ছাড় পেয়ে থাকলে সময়মতো রিটার্ন না দেওয়ার কারণে সেই সুবিধা প্রভাবিত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে করদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, শুধু বিনিয়োগ করলেই কর ছাড় নিশ্চিত হয় না। সংশ্লিষ্ট বিধান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং রিটার্ন জমার সময়সীমা মেনে চলাও প্রয়োজন।
৩. বাড়তি করের বোঝা
নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে অতিরিক্ত করের দায়ও তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলম্বের কারণে আরোপিত করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে বাড়তি কর দিতে হতে পারে।
এ ধরনের অতিরিক্ত দায় করদাতার মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ বাড়িয়ে দেয়। ফলে যে ব্যক্তি সময়মতো রিটার্ন জমা দিয়ে করসংক্রান্ত দায়িত্ব সম্পন্ন করতে পারতেন, তাঁকে বিলম্বের কারণে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
তবে অতিরিক্ত করের হিসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, প্রযোজ্য সময়সীমা এবং করদাতার পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। তাই নিজের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা বা কর পরামর্শকের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
৪. গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঝুঁকি
আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়ার সবচেয়ে গুরুতর পরিণতির একটি হলো রাষ্ট্রীয় পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হওয়া। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্তে কর কর্মকর্তারা আবাসিক বাড়ি কিংবা শিল্পকারখানার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিতে পারেন। পানিসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় পরিষেবার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রতিষ্ঠানের আয়, কর্মীদের কাজ এবং সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে রিটার্ন জমা না দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত, কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
৫. বেতন-ভাতা পাওয়ায় জটিলতা
নির্দিষ্ট শ্রেণির সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীর জন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দিলে বেতন-ভাতা ছাড়ের প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাছ থেকে রিটার্ন জমার প্রমাণ চাওয়া হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে না পারলে বেতন-ভাতা পরিশোধে বিলম্ব বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে যাঁদের চাকরির ধরন ও পদ অনুযায়ী রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক, তাঁদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে সব চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়; সংশ্লিষ্ট বিধান ও প্রতিষ্ঠানের প্রযোজ্য নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
চলতি অর্থবছরে রিটার্ন জমার সময়সীমা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে কোন সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর কর ছাড়, অতিরিক্ত কর কিংবা জরিমানার প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিলে নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে হয়। জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করের পাশাপাশি জরিমানাও আরোপিত হতে পারে।
এ কারণে করদাতাদের জন্য শুধু রিটার্ন জমা দেওয়াই নয়, সঠিক সময়ে জমা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযোজ্য সময়সীমা ও ছাড়ের শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।
করদাতাদের এখন কী করা উচিত
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া অনেকের কাছে কাগজপত্রের জটিল প্রক্রিয়া মনে হতে পারে। কিন্তু সময়মতো প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করা এবং নিজের করযোগ্য আয় ও প্রযোজ্য বিধান যাচাই করলে শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি কমানো সম্ভব।
প্রথমে দেখতে হবে, নিজের আয় ও পেশাগত অবস্থার ভিত্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না। এরপর আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও প্রযোজ্য কর ছাড়ের তথ্য প্রস্তুত করে নির্ধারিত নিয়মে রিটার্ন জমা দিতে হবে। প্রয়োজন হলে কর কার্যালয় বা যোগ্য কর পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, রিটার্ন জমা দেওয়া শুধু জরিমানা এড়ানোর বিষয় নয়। এটি আয় ও করসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়মতো দায়িত্ব পালন করলে অতিরিক্ত আর্থিক দায়, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা পেতে সমস্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

