পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সুরক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কর্মক্ষেত্রে তাপ-চাপ নিয়ে আলাদা মানদণ্ড তৈরি, প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ, শিল্প প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো। শ্রমিকদের নিরাপত্তা-নীতি সংশোধন, ছোট কারখানার জন্য সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং সরবরাহকারীদের কুলিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগে সহায়তা করতেও সরকার, কারখানা মালিক ও ব্র্যান্ডগুলোকে একযোগে কাজ করতে বলা হয়েছে।
গতকাল ২৭ অক্টোবর রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে “সিক্স সিজনস, ফোর সামারস” শীর্ষক গবেষণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা উঠে আসে। লায়লা গ্রুপের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. শামীম ফেরদৌস বলেন, উৎপাদন ফ্লোরে সর্বোচ্চ কত তাপমাত্রা গ্রহণযোগ্য, তা সরকার নীতিমালার মাধ্যমে ঠিক করে দিতে পারে। তবে কুলিং সিস্টেম বসানোর প্রাথমিক খরচের দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জেসন জাড জানান, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন শিল্পের জন্য কর্মক্ষেত্রে তাপ-চাপের মানদণ্ড আছে।
গবেষণাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিইডি), বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস) এবং ওয়াইজেন ইঞ্জিনিয়ারিং। কর্মক্ষেত্রে তাপ-চাপ সংক্রান্ত মানদণ্ডে সাধারণত তাপ কীভাবে মাপা হবে, কখন বাড়তি বিরতি দিতে হবে এবং ঝুঁকি কমাতে নিয়োগকর্তাকে কী করতে হবে, তা নির্দিষ্ট করা থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকরা এখন প্রায় সাত মাস, অর্থাৎ এপ্রিলের শুরু থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত, তাপ-চাপের মধ্যে কাজ করেন। ঢাকা অঞ্চলের আটটি কারখানায় ২৮টি জলবায়ু সেন্সর বসিয়ে বিভিন্ন সেকশনের অবস্থা প্রতি ঘণ্টায় পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকরা। পাশাপাশি প্রায় তিন ডজন শ্রমিকের বাসাও নজরে রাখা হয়েছে।
সারা বছরই কারখানার ভেতরের তাপ-চাপ বাইরের চেয়ে বেশি ছিল। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইস্ত্রি ও ফিনিশিং সেকশনে। সেখানকার শ্রমিকরা কর্মদিবসের ৫৮ শতাংশ সময় ‘উচ্চ’ তাপ-চাপ অঞ্চলে কাটান, আর প্রায় ১৮ শতাংশ সময় কাটে ‘তীব্র’ শ্রেণিতে।
সমস্যা কারখানার বাইরেও থেকে যায়। জুনের একটি সাধারণ সপ্তাহে রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। কিছু বাসা সন্ধ্যার পর কারখানার ফ্লোরের চেয়েও গরম থাকে এবং রাতে প্রায় ঠান্ডাই হয় না। তাপ-চাপের কারণে অংশগ্রহণকারী কারখানাগুলোতে কর্মঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদনশীলতা গড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ফ্যাব্রিক মিলে এই ক্ষতি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, কারখানার অবস্থান, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ভবনের নকশা অনুযায়ী উৎপাদক ও ক্রেতাদের তাপ-চাপ পরিমাপ করা উচিত। যোগ্য প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে কুলিং সমাধানের খরচ ও লাভ বিশ্লেষণ এবং খরচ কীভাবে ভাগ হবে তা ঠিক করার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মঘণ্টা, কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য, পিস রেট, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং অসুস্থতাজনিত ছুটি নিয়ে নিরাপত্তা-নীতি সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকৌশলগত মূল্যায়ন অনুযায়ী, কুলিং বিনিয়োগের খরচ তুলনামূলক দ্রুত উঠে আসে। প্রাথমিক পরিস্থিতিতে গড় সময় লাগে এক বছরের কম, হতাশাজনক পরিস্থিতিতে ২ দশমিক ৯ বছর এবং সবচেয়ে খারাপ ক্ষেত্রে ৪ দশমিক ৪ বছর। পুরো রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে উচ্চ তাপ-চাপ কমাতে আনুমানিক ২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার মূলধনি ব্যয় লাগবে। তিন বছরে ভাগ করলে এটি ২০২৫ সালের পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ০.২ শতাংশ।
বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক ও শ্রমিক নেত্রী কল্পনা আক্তার বলেন, শ্রমিকদের কথা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, এটাই মূল চ্যালেঞ্জ। কারখানা ও বাসা, দুই জায়গাতেই গরমে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কখনো কখনো ছুটি নিতেও বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউনিক্লো বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সৌরভ কুমার মৈত্র, ওয়াইজেন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রবিন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ আরিফুল ইসলাম।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

