বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৫১৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৩৪ মিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে আমদানি করা উৎপাদন সরঞ্জামের বিপরীতে ঋণপত্র নিষ্পত্তির পরিমাণ ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমে ৪৩৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪৪৪ মিলিয়ন ডলার।
এই চিত্র আগের অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের প্রবণতার বিপরীত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ ২৪ শতাংশ বেড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল।
গ্যাস সংকটে থমকে যায় উৎপাদন
জুলাই মাসে কক্সবাজারের একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে দেশে গ্যাস সরবরাহের সংকট তীব্র হয়। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়, যা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জ্বালানি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ঋণপত্র খোলার পরিমাণ থেকে ব্যবসায়ীদের নতুন যন্ত্রপাতি কেনা ও বিনিয়োগের আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ঋণপত্র নিষ্পত্তির তথ্য দেখায় আমদানির বিপরীতে বাস্তবে কত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই পতন শিল্প খাতের বিনিয়োগে সতর্কতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উচ্চ সুদ ও দুর্বল রপ্তানি চাহিদায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত নিতে সতর্ক হচ্ছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপে চাহিদা দুর্বল হওয়ায় কারখানাগুলোতে নতুন ক্রয়াদেশ কমেছে।
উচ্চ সুদের হার, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা বড় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ব্যয়বহুল ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান হাতে থাকা অর্থ ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তাসকিন আহমেদ। তাঁর মতে, এতে আমদানির বিকল্প দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
সব শিল্পে একই প্রবণতা নেই
মূলধনি যন্ত্রপাতির সামগ্রিক আমদানি কমলেও কয়েকটি শিল্প খাতে নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ বেড়েছে। তবে নতুন ঋণপত্র খোলার বৃদ্ধি সব ক্ষেত্রে বাস্তব আমদানি বা অর্থ পরিশোধ বৃদ্ধিতে রূপ নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বস্ত্রশিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের ১৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২০ শতাংশ। তবে ঋণপত্র নিষ্পত্তি ২৯ শতাংশ কমে ২৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে; আগের বছর যা ছিল ৩৩ মিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক খাতে নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়ে ৭৩ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। কিন্তু নিষ্পত্তি ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ কমে ৮৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ওষুধশিল্পেও নতুন যন্ত্রপাতি আমদানির প্রতিশ্রুতি বেড়েছে। এ খাতে নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ ৩১ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে ২৭ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। বিপরীতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি ১০ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ১৮ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
অন্যদিকে, ‘অন্যান্য শিল্প’ শ্রেণিতে নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৩৮১ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে এই শ্রেণিতে নিষ্পত্তির পরিমাণ ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়ে ৩০৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, শিল্পভেদে যন্ত্রপাতির চাহিদা ও আমদানির বাস্তব চিত্র আলাদা। কয়েকটি খাতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়লেও সামগ্রিক পতন ঠেকানোর জন্য তা যথেষ্ট হয়নি।
বিনিয়োগকারীদের আস্থার দুর্বল প্রতিফলন
নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি—দুই ক্ষেত্রেই পতন অর্থনীতির ধীরগতি এবং বিনিয়োগকারীদের দুর্বল আস্থার প্রতিফলন।
তাঁর মতে, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদায় স্থবিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে অনেক বিনিয়োগকারী আশা করেছিলেন। তবে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে মনে করেন তিনি। ফলে নতুন কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেক উদ্যোক্তা।
সামগ্রিক আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন মাসরুর রিয়াজ। মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামালের আমদানিও কিছুটা বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা কম
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের প্রশাসক এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোর জ্বালানি সংকট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে।
তাঁর মতে, আমদানি করা যন্ত্রপাতি চালাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট থাকলে নতুন যন্ত্রপাতি কিনেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সংকট কিছুটা কমায় মূলধনি যন্ত্রপাতির নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে শিল্প খাত অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরে পাবে—এমন সম্ভাবনা কম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণব্যয় এবং দুর্বল রপ্তানি চাহিদা শিল্প বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে রয়েছে। পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি না হলে নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি, কারখানা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি দ্রুত ফিরবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

