দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসছে প্রচলিত ও মৌলিক ধরনের পোশাক থেকে। এতে রপ্তানি বাড়লেও পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজার সম্প্রসারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রথম প্রান্তিকের বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মৌলিক পোশাকের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৮২৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। মোট পোশাক রপ্তানিতে এই শ্রেণির পণ্যের অংশও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই অংশ ছিল ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা এবার বেড়ে হয়েছে ৭৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, দেশের পোশাক রপ্তানি যত বাড়ছে, তার বড় অংশই আসছে মৌলিক পোশাক থেকে। অন্যদিকে, তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজন হয় এমন পোশাকের রপ্তানি অংশ কমেছে।
তিন পণ্যে রপ্তানি বৃদ্ধির বড় অবদান
মৌলিক পোশাকের মধ্যে ট্রাউজার বা প্যান্ট, সোয়েটার ও কার্ডিগান এবং টি-শার্ট ও ভেস্ট রপ্তানি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। আলোচ্য তিন পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২০ কোটি ১০ লাখ, ১৭ কোটি ৮০ লাখ এবং ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
সব মিলিয়ে, পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে এই তিন পণ্য থেকে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
শিশুদের পোশাকের রপ্তানি বৃদ্ধির হার অবশ্য সবচেয়ে বেশি, ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে এই খাতে মোট রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৩০ কোটি ডলার।
আধা-মৌলিক পোশাকেও কমেছে অংশ
মৌলিক পোশাকের বাইরে আধা-মৌলিক পোশাকের রপ্তানিতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। মোট পোশাক রপ্তানিতে এই শ্রেণির অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে, উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানি অংশ আরও কমেছে। আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই অংশ ছিল ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে।
এই প্রবণতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাধারণ পোশাকের রপ্তানি বাড়লেও তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের অংশ কমে যাওয়ায় রপ্তানির কাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
উচ্চমূল্যের পোশাকে পিছিয়ে বাংলাদেশ
উচ্চমূল্যের পোশাকের বিভিন্ন শ্রেণিতে রপ্তানির চিত্রও দুর্বল। উন্নত মানের পোশাকের মধ্যে আউটডোরওয়্যার, যেমন কোট, জ্যাকেট, ব্লেজার ও ওভারকোটের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ২ কোটি ১০ লাখ ডলার। একই সময়ে বিশেষায়িত পোশাকের রপ্তানি হয়েছে ৩০ লাখ ডলারের, আর কারিগরি পোশাকের রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের।
অন্যদিকে, গাউন, লম্বা গাউন বা এক টুকরার নারীদের পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাকটিভওয়্যারের রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং স্যুট ও এনসেম্বলের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তবে এসব পণ্যের মোট রপ্তানিতে অংশ তুলনামূলক সীমিত।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চমূল্যের পোশাকের মোট রপ্তানি অংশ ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়েছে। ফলে বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক পোশাকের রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এই খাতে উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমিকের দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক দেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের দিকে অগ্রসর হওয়াও জরুরি হয়ে উঠছে।
উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তি, নকশা ও পণ্যের মান উন্নয়ন, দক্ষ জনবল এবং গবেষণায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য তৈরি ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যদি মূলত কয়েকটি মৌলিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে উচ্চমূল্যের বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

