বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে জাপানের বাজারে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সফটওয়্যার তৈরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
জাপানে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীর ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বাড়াতে বিনিয়োগ করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দক্ষ প্রকৌশলী, তুলনামূলক কম সেবামূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জাপানের বাজারে অবস্থান শক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষ জনবল তৈরি, কাজের মান নিশ্চিত করা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো এবং জাপানি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যম বয়স ২৬ বছর এবং দেশে তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীর সংখ্যা ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এই তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি দীর্ঘমেয়াদে জাপানের প্রযুক্তি খাতের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানের প্রযুক্তিবাজারে বড় সুযোগ
বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির নির্বাহী পরিচালক এম জে ফেরদৌস বলেন, জাপানের প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহৃত একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার। ২০১৮ সাল থেকে জাপানের বাজারে কাজ করছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।
তাঁর মতে, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সফটওয়্যার ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করতে পারে। দক্ষ প্রকৌশলীদের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যুক্ত করে জাপানের মান অনুযায়ী সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের সময়ের ব্যবধানও এ ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি করে। সারা বছর জাপান বাংলাদেশের চেয়ে তিন ঘণ্টা এগিয়ে থাকে। ঢাকায় সকাল ৯টা হলে টোকিওতে দুপুর ১২টা। ফলে দুই দেশের প্রতিষ্ঠান একই কর্মদিবসের বড় একটি অংশে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সেবামূল্য প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার সুযোগ রয়েছে।
ফেরদৌসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাপান প্রতিবছর সফটওয়্যার সেবা বাইরে থেকে নেওয়ার জন্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ভিয়েতনাম একাই এই বাজারের আনুমানিক ৬ থেকে ৭ শতাংশ দখল করেছে। বাংলাদেশের অংশ এখনো সামান্য হওয়ায় প্রবৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। জাপানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হলে দুই দেশের সরকার এমন সহায়ক ব্যবস্থা নিতে পারে, যাতে যৌথ উদ্যোগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা সহজ হয়।
একই সঙ্গে জাপান সফরে সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা হলে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়বে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করাও সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
মান, অবকাঠামো ও নীতিগত জটিলতা বড় বাধা
জাপানের বাজারে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি নয়, উচ্চমূল্যের পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটপণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্য রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব রাবিউল আলম বলেন, এসব খাতে সম্ভাবনা থাকলেও রপ্তানি বাড়ানোর পথে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পণ্য পরিবহনের ব্যয়, নীতির ধারাবাহিকতা, শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া এবং মুনাফা দেশে ফিরিয়ে আনার জটিলতা।
জাপানের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের কঠিন বাজারগুলোতে প্রবেশের পথও সহজ হতে পারে।
তবে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, জটিল শুল্ক ও করব্যবস্থা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে দিতে পারে। ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তুলনামূলক দ্রুত ও সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার সুবিধা দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আসবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়তে পারে।
তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্ককে প্রচলিত সহায়তানির্ভর সহযোগিতার বাইরে নিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য বাণিজ্য সহজীকরণ, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাপানের পোশাকবাজারেও বাড়ছে নজর
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে জাপানের অংশ ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। তবে বছরভেদে রপ্তানির পরিমাণে পরিবর্তন হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। পরের অর্থবছরে ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে রপ্তানি হয় ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার হয়। এতে মোট রপ্তানিতে জাপানের অংশ দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশ জাপানে ৩৪৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। ওই সময়ে মোট ১০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির মধ্যে জাপানের অংশ ছিল ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত চার বছরের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ অংশ।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত জাপান ২৪ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল। পরবর্তী বছরে আমদানি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার হয়। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে জাপান ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে।
জাপানের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সম্প্রতি জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে আলাদা যোগাযোগকেন্দ্র চালু করেছে। জাপানের প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের পোশাকবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করাই এর লক্ষ্য।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, এই কেন্দ্র জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে উপযুক্ত বাংলাদেশি কারখানার যোগাযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে যেসব ক্রেতা ছোট ও নমনীয় ক্রয়াদেশ দিতে চান, তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী কারখানা নির্বাচনেও সহায়তা করা হবে।
তিনি বলেন, ছোট ক্রয়াদেশ মানেই ছোট ক্রেতা নয়। ক্রেতার চাহিদার পরিমাণ অনুযায়ী সঠিক কারখানার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তাঁর মতে, এটি কোনো একক কর্মকর্তার উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও জাপানি ক্রেতাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানসহ বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়াতে ফেডারেশনের রপ্তানি গবেষণা বিভাগ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে ফেডারেশন।
তিনি মনে করেন, নতুন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার জন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
জাপান সফরে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতার প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর আগামীকাল শেষ হওয়ার কথা। সফর চলাকালে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও বিস্তৃত করে পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
এর আগে ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ শুধু তৈরি পোশাক নয়, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য ও সেবার রপ্তানিও বাড়াতে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ জনবল, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং কার্যকর সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সম্ভাবনাকে বাস্তব ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দেওয়া। জাপানের প্রযুক্তি ও বাণিজ্যবাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করতে পারলে দেশের রপ্তানি আয়ের উৎস বাড়বে এবং তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমানোর পথও প্রসারিত হবে।

