২০২৩ সালের আগস্টে তৎকালীন সরকার সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী এবং প্রবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের মাধ্যমে বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু চালুর পর তিন বছরে দুবার সরকার পরিবর্তন হওয়ায় কর্মসূচিটি নিয়ে ধারাবাহিক প্রচার ও জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি চালুর প্রথম ১০ মাসেই তিন লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ২০ মাসে নতুন করে যুক্ত হন মাত্র ৩৮ হাজার ৩৪ জন। বর্তমানে মাসে গড়ে প্রায় ১৫০ জন নতুন গ্রাহক নিবন্ধন করছেন। ফলে বিপুল জনগোষ্ঠীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত।
সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সর্বজনীন পেনশন বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রবীণদের দারিদ্র্য কমানো এবং কর্মজীবন শেষে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা তৈরিতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের অনেকেরই চাকরিজীবীদের মতো অবসরকালীন ভাতা বা নিয়মিত পেনশনের সুযোগ নেই। রিকশাচালক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের আওতায় আনতে পারলে ভবিষ্যতে আর্থিক অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যবস্থাপনা ভালো হলে সর্বজনীন পেনশন দেশের সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষকে এই ব্যবস্থায় যুক্ত করা গেলে তাঁদের জীবনের শেষ পর্যায়ে জমা অর্থ বড় অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও মনে করেন, কর্মসূচিটি অনেকের কাছে নতুন হওয়ায় এর নিয়ম, সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা সহজভাবে বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো গেলে মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে।
বিনিয়োগে মুনাফা মিললেও বাড়ছে না অংশগ্রহণ
গ্রাহকসংখ্যা কম থাকলেও পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জিত হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা পাওয়া গেছে।
ওই অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির অধীনে বিনিয়োগ করা অর্থ থেকে মোট ২৮ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮ টাকা ৮০ পয়সা মুনাফা অর্জিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এই মুনাফা গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক গ্রাহকের জমার পরিমাণ এবং কত দিন ধরে অর্থ জমা রয়েছে, তার ভিত্তিতে অর্জিত মুনাফা নিজ নিজ পেনশন হিসাবে যোগ করা হবে।
তবে বিনিয়োগে মুনাফা অর্জনের তথ্য থাকলেও নতুন গ্রাহক যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের কাছে কর্মসূচিটির সুবিধা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আস্থা তৈরি করা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চার ধরনের পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সুযোগ
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী জাতীয় পরিচয়পত্রধারী বাংলাদেশি নাগরিকেরা প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধন করতে পারেন। বর্তমানে এতে চারটি পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে ‘প্রবাস’ ব্যবস্থা। এতে প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা দিতে পারেন। দেশে ফিরে চাইলে সমপরিমাণ অর্থ দেশীয় মুদ্রায় জমা দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। মেয়াদ পূর্ণ হলে পেনশনের অর্থ দেশীয় মুদ্রায় দেওয়া হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে ‘প্রগতি’ ব্যবস্থা। এতে কর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে অথবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অংশ নিতে পারেন। প্রতিষ্ঠান চাইলে তার কর্মীদের জন্য নির্ধারিত হারে চাঁদা জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারে।
রিকশাচালক, শ্রমিক, কামার, কুমারসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে ‘সুরক্ষা’ ব্যবস্থা। অন্যদিকে, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা এবং যাঁদের বার্ষিক আয় সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা, তাঁদের জন্য রয়েছে ‘সমতা’ ব্যবস্থা।
শ্রমজীবীদের কাছে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ
রাজধানীতে সাত বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছেন রহীম মোল্লা। সর্বজনীন পেনশন সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে তাঁর মতো শ্রমজীবী মানুষেরাও যে নিয়মিত অর্থ জমা রেখে ভবিষ্যতে পেনশনের সুবিধা পেতে পারেন, তা আগে জানতেন না বলে জানান তিনি।
রহীম মোল্লার মতে, কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় আয় করা সম্ভব হলেও বয়স বাড়লে কাজ করার সামর্থ্য কমে যেতে পারে। তখন নিজের জমানো অর্থ কাজে লাগলে সন্তানদের কাছে আর্থিক সহায়তা চাইতে হবে না।
তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, কর্মসূচিটির সুযোগ থাকলেও অনেক সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য এখনো পৌঁছায়নি। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
পেনশনের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হয়
সর্বজনীন পেনশন তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিল ও সুকুকে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অনুমোদিত মিউচুয়াল ফান্ডসহ নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
এ ছাড়া ‘এএ’ মানের ঋণমানসম্পন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ‘এ’ শ্রেণির বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার বা সরকারি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা সিকিউরিটিজেও অর্থ বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
বিধিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে পেনশন তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে না। দেশের বাইরেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরির ওপর। প্রায় ১০ কোটি নাগরিককে যুক্ত করার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শুধু নিবন্ধনের সুযোগ রাখলেই হবে না; কর্মসূচিটির সুবিধা, নিয়ম ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়গুলো মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে হবে।

