১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্পের বাজার একসময় দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছিল। ২০২২ সালে দেশে ক্যাবলের বাজারের আকার ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে তা কমে আনুমানিক ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শতাধিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সীমিত চাহিদার মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে। একই সঙ্গে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের ব্যয় এবং আমদানির জটিলতা শিল্পটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সরকারি প্রকল্প ও আবাসন খাতের মন্দায় চাহিদা কমেছে
বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজের বিপণন বিভাগের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম রনি জানান, দেশের ক্যাবল বাজারের ৩০ শতাংশের বেশি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল।
তাঁর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে সরকারি প্রকল্পের কাজ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আবাসন খাতেও ক্যাবলের চাহিদা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রতিযোগিতার কারণে সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে কম মুনাফায় কিংবা লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।
দেশে বিদ্যুতায়ন, শিল্পায়ন ও আবাসন খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে ক্যাবল শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। ২০০৮ সালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার এই বাজার ২০২২ সালে ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক মন্দায় সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ওয়ালটন ক্যাবলসের ব্যবসাপ্রধান রাজু আহমেদ বলেন, ক্যাবল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ চলতি মূলধন প্রয়োজন হয়। কারণ পণ্য বিক্রির অর্থ পাওয়ার আগেই উৎপাদনকারীদের তামা, অ্যালুমিনিয়াম, রেজিনসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।
বিক্রি কমে যাওয়া এবং ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ ও উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন হচ্ছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরে বাজার প্রায় ২৫ শতাংশ ছোট হয়েছে।
উৎপাদন বন্ধ, শ্রমিকদের বেতন বকেয়া
চলমান সংকটের বড় উদাহরণ প্যারাডাইস ক্যাবলস। একসময় প্রতিষ্ঠানটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্যাবল চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করত এবং ২৪টি দেশে পণ্য রপ্তানি করত।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবারক হোসেন জানান, খেলাপি ঋণ, আমদানির ঋণপত্র খুলতে সমস্যা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় কারখানার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে প্যারাডাইস ক্যাবলসের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকদের ২৫ থেকে ৩০ মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঋণ আদায়ের জন্য এবি ব্যাংক কারখানাটি নিলামে তুলেছে।
শুধু প্যারাডাইস ক্যাবলস নয়, দেশের আরেক পরিচিত প্রতিষ্ঠান বিবিএস ক্যাবলসও বড় আর্থিক সংকটে পড়েছে।
প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিবিএস ক্যাবলসের কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ১৪৫ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৮৬ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।
কোম্পানির কর্মকর্তাদের দাবি, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, বড় সরকারি দরপত্রের কাজ না পাওয়া, কাঁচামাল আমদানির জটিলতা এবং অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আয় প্রায় ৪৬ শতাংশ কমে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকঋণের ১২ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ঋণপত্র খোলার সীমাবদ্ধতা উৎপাদনকারীদের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
পারটেক্স ক্যাবলস, সিটিজেন ক্যাবলস, গোল্ডেন ক্যাবলস ও সান ক্যাবলসও আর্থিক চাপ এবং উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যার মুখে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সংকটের মধ্যেও অবস্থান শক্ত করছে বড় কোম্পানিগুলো
বাজারে চাহিদা কমলেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, বিস্তৃত বিপণনব্যবস্থা এবং সহজে মূলধন সংগ্রহের সক্ষমতা থাকায় তুলনামূলক বড় কোম্পানিগুলো এই পরিস্থিতিতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
কোম্পানি ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ক্যাবলের বাজারে এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির বাজার অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশের বেশি। সেখানে সরাসরি ১০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন।
আরএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো ক্যাবল শিল্পে কার্যক্রম বাড়ানোর ফলে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্যের মান বজায় রাখা এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের অধীন বিজলী ক্যাবলসও বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
আর এন পালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের পাওয়ার ক্যাবলের বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ক্যাবলের বাজারের ২৫ শতাংশ বর্তমানে বিজলী ক্যাবলসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি হবিগঞ্জ শিল্পপার্কে চারটি কারখানায় প্রায় ২২০ কোটি টাকা এবং মাঝারি ভোল্টেজের ক্যাবল উৎপাদনকেন্দ্রে আরও ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার টন বেড়েছে।
অন্যদিকে, নিজেদের বৈদ্যুতিক ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে ২০১৯ সালের শেষ দিকে ক্যাবল শিল্পে প্রবেশ করে ওয়ালটন। এরপর প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করেছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আকিজবশির গ্রুপ বাসাবাড়ি, শিল্প ও যোগাযোগ খাতের ক্যাবল উৎপাদনের জন্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও এক-দুই বছর চাপ থাকতে পারে
ওয়ালটন ক্যাবলসের রাজু আহমেদ মনে করেন, দেশের ক্যাবল শিল্পে বর্তমান সংকট আরও এক থেকে দুই বছর স্থায়ী হতে পারে।
তবে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পগুলো আবার চালু হলে এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থায় ভূগর্ভস্থ ও মাঝারি ভোল্টেজের ক্যাবলের ব্যবহার বাড়লে বাজারে চাহিদা ফিরে আসতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি নতুন বিনিয়োগ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, বিদ্যমান কারখানাগুলো যখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, তখন নতুন কারখানা স্থাপন করলে বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এতে পণ্যের দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমদানিনির্ভরতা ও সস্তা পণ্যেও চাপ
দেশে ক্যাবল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিশেষায়িত এবং মাঝারি ভোল্টেজের ক্যাবলের ক্ষেত্রে এখনো আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
আর এন পালের তথ্য অনুযায়ী, খাতসংশ্লিষ্টদের আগের হিসাবে দেশের মোট ক্যাবল চাহিদার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। অন্যদিকে, মাঝারি ভোল্টেজের ক্যাবলের মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশের মতো স্থানীয় উৎপাদনকারীরা সরবরাহ করতে পারেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ক্যাবল তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে গড় শুল্ক প্রায় ৪০ শতাংশ। আর তৈরি ক্যাবল আমদানিতে গড় শুল্ক প্রায় ৪৫ শতাংশ। তবে পণ্যের শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী প্রকৃত হার ভিন্ন হতে পারে।
উৎপাদনকারীদের দাবি, বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত সরকারি প্রকল্পগুলোতেও যোগ্য দেশীয় কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতার ন্যায্য সুযোগ দিতে হবে।
অন্যদিকে, কম দামের নামহীন ও অননুমোদিত ক্যাবলও বাজারের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্তমান বাজারের নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ পরিসংখ্যান না থাকলেও আগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার পরিচিত ব্র্যান্ডের ক্যাবল বাজারের বিপরীতে নামহীন ক্যাবলের বাজারের আকার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল ক্যাবলস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আনিসুর রহমান বলেন, অননুমোদিত উৎপাদন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা এখনো কঠিন। অনেক ক্রেতা ক্যাবলের প্রয়োজনীয় কারিগরি মান যাচাই না করেই শুধু কম দামের কারণে এসব পণ্য কিনছেন।
এতে মানসম্মত ক্যাবল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। পাশাপাশি নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ক্যাবল ব্যবহারের কারণে নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
দেশের ক্যাবল শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বিক্রি কমে যাওয়ার সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংকঋণ, সরকারি বিনিয়োগ, আমদানিনির্ভরতা এবং বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলো।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফিরিয়ে আনা, সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাতে আবার প্রবৃদ্ধি আসতে পারে। তবে চাহিদা দ্রুত না বাড়লে ছোট ও মাঝারি উৎপাদনকারীদের জন্য টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

