ধরা যাক, একজন জমির মালিকের জমি কেনা এবং সেখানে বাড়ি নির্মাণে মোট প্রকৃত বিনিয়োগ ৬০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ আয়বর্ষে তিনি একটি ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করে এক কোটি টাকা সাইনিং মানি পেলেন। নির্মাণকাজ চলাকালে অস্থায়ী আবাসনের জন্য আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া সুবিধা পেলেন। এ ক্ষেত্রে সাইনিং মানি ও বাড়িভাড়ার সুবিধা সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের রিটার্নে মূলধনি মুনাফার অংশে দেখাতে হবে। আয়কর আইন অনুযায়ী, ডেভেলপার সাইনিং মানি, বাড়িভাড়া বা এ ধরনের অন্য অর্থ পরিশোধের সময় ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটবেন। সেই হিসাবে এক কোটি টাকা সাইনিং মানি থেকে ১৫ লাখ টাকা এবং ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার বিপরীতে ৫৪ হাজার টাকা করের হিসাব আসে। উৎসে কর ও অন্যান্য কর পরিশোধের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ পরে চূড়ান্ত কর হিসাবের সময় আগের পরিশোধিত অর্থ সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।
পরের বছর ভবনের কাজ চললেও যদি জমির মালিক নতুন করে সাইনিং মানি বা ফ্ল্যাট না পান, শুধু চুক্তি অনুযায়ী আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া সুবিধা পান, তবে সেই অর্থও সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের রিটার্নে দেখাতে হবে। উদাহরণে ১৫ শতাংশ হারে এর বিপরীতে করের পরিমাণ ৫৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ, প্রকল্প তিন বছর ধরে চললে এক বছরের সুবিধার হিসাব অন্য বছরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কোন বছরে কী সুবিধা পাওয়া গেছে এবং তার বিপরীতে কত কর পরিশোধ হয়েছে, সে অনুযায়ী নথি রাখতে হবে।
এবার ধরা যাক, তৃতীয় বছরে ভবন নির্মাণ শেষ হলো এবং জমির মালিক চুক্তি অনুযায়ী চারটি ফ্ল্যাট বুঝে পেলেন। ফ্ল্যাটগুলোর মোট বাজারমূল্য ২ কোটি টাকা। তখন পুরো প্রকল্পের বিনিময়ে পাওয়া সুবিধার মূল্য একত্র করলে হিসাব দাঁড়ায় এক কোটি টাকা সাইনিং মানি, দুই বছরে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার সুবিধা এবং ২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে মোট প্রাপ্তির মূল্য ৩ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এখান থেকে জমি ও বাড়ির মোট অর্জনমূল্য ৬০ লাখ টাকা বাদ দিলে নিট মূলধনি মুনাফা দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এনবিআরের পরিপত্রে দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, এই মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে মোট কর হবে ৩৭ লাখ ৮ হাজার টাকা।
তবে পুরো ৩৭ লাখ ৮ হাজার টাকা নতুন করে পরিশোধ করতে হবে না। সাইনিং মানি থেকে আগে কেটে রাখা ১৫ লাখ টাকা এবং দুই বছরে বাড়িভাড়ার সুবিধার বিপরীতে পরিশোধিত মোট ১ লাখ ৮ হাজার টাকা সমন্বয় করলে অবশিষ্ট কর দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, আগে কর কেটে রাখা বা পরিশোধিত অর্থের প্রমাণ থাকলে তা চূড়ান্ত করদায় নির্ধারণের সময় কাজে লাগবে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৫৮ ধারায় ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে যুক্ত নতুন উপধারা অনুযায়ী, ডেভেলপারের কাছ থেকে জমি বা বাড়ি উন্নয়নের বিনিময়ে পাওয়া সুবিধার ওপর মূলধনি মুনাফা কর নির্ধারণের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে এই কর সংশ্লিষ্ট করবছর এবং পরবর্তী দুই করবছরে সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এনবিআরের উদাহরণে অবশিষ্ট ২১ লাখ টাকা একবারে দেওয়ার পরিবর্তে তিন করবছরে ৭ লাখ টাকা করে পরিশোধের হিসাব দেখানো হয়েছে। তবে কিস্তিতে কর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান, সংশ্লিষ্ট করবছর ও রিটার্ন দাখিলের নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি।
ডেভেলপারকে জমি বা বাড়ি দেওয়ার চুক্তি থাকলে তাই শুধু সাইনিং মানি বা ফ্ল্যাটের দলিল সংরক্ষণ করলেই হবে না। জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণে প্রকৃত ব্যয়ের প্রমাণ, উন্নয়ন চুক্তি, প্রাপ্ত সুবিধার মূল্য নির্ধারণের তথ্য এবং উৎসে কর জমার সনদও রাখতে হবে। এসব নথি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে প্রতি আয়বর্ষের রিটার্ন তৈরি, আগের কর সমন্বয় এবং প্রকল্প শেষে চূড়ান্ত কর হিসাব নির্ধারণ সহজ হবে। ব্যক্তিভেদে অর্জনমূল্য ও চুক্তির শর্ত ভিন্ন হতে পারে বলে রিটার্ন দাখিলের আগে সংশ্লিষ্ট করবিধি মিলিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনে কর পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যুক্তিযুক্ত।

