বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় মেটাতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অথচ সেই ভর্তুকি পাওয়া সরকারি কোম্পানিগুলোই মুনাফা দেখিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রফিট বোনাস বিতরণ করছে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের দেওয়া অর্থ কোম্পানির হিসাবে কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা স্পষ্ট না থাকায় লোকসানের বদলে মুনাফা দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২৫ সালের এপ্রিলে এক চিঠিতে বিষয়টি উল্লেখ করেছিল। ওই চিঠিতে বলা হয়, সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ কোম্পানিগুলো লোকসানের দায় হিসেবে ধরছে না। ফলে হিসাবে মুনাফা দেখা যাচ্ছে এবং সেই মুনাফা থেকে কর্মীদের বোনাস দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ এই বোনাস না দেওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছে। কিন্তু এখন নতুন করে স্পষ্ট নির্দেশনা না এলে সংশোধিত শ্রম আইনের কারণে মুনাফা বণ্টন করতেই হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির হিসাবটি বেশ স্পষ্ট। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সায় বিক্রি করছে। অথচ এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১২ টাকা ৯১ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ঘাটতি ৪ টাকা ৫২ পয়সা। এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। এই হিসাবে বিদ্যুৎ খাতে বছরে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। এমন বাস্তবতায় কোম্পানিগুলোর মুনাফা নির্ধারণে ভর্তুকির হিসাব ঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিষয়টির নীতিগত পটভূমিও আছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিলের একটি আদেশে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুনাফা বণ্টনের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে। এর আগে ১৬ এপ্রিলের এক সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই কোম্পানির হিসাব নির্ধারণে সরকারি সহায়তা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
পরে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগ আরেকটি আদেশ জারি করে। তাতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারি মালিকানাধীন এবং সরকার-টু-সরকার (জি টু জি) যৌথ অংশীদারত্বের কোম্পানিগুলো ভর্তুকি চলাকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লভ্যাংশ বণ্টন করতে পারবে না। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকারি ভর্তুকিতে চলা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেই এই নির্দেশ প্রযোজ্য। ফ্যাসিলিটি অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় নেওয়া বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের আগেও লভ্যাংশ বণ্টন না করার কথা বলা হয়। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বিদ্যুৎ খাতের অনেক কোম্পানিই এই নির্দেশ মানছে না।
এর মধ্যে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে শ্রম আইনের সংশোধনী। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রফিট বোনাস না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকলেও শ্রম আইনের সংশোধনীতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বর্তমান সরকারের আমলে গত ১০ এপ্রিল সেই অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়। শ্রম আইনে মুনাফা বণ্টনের ব্যবস্থা থাকায় বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফার ৫ শতাংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডসহ সংশ্লিষ্ট তহবিলে জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুনাফার অংশ পাওয়ার কথা। সংশ্লিষ্টদের মতে, জানুয়ারির নির্দেশে আটকে থাকা লভ্যাংশও এখন দিতে হতে পারে। এতে সরকারের প্রতিবছর অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হতে পারে।
বাস্তবে এই মুনাফা বিতরণ ইতিমধ্যে চলছে। জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতের পাঁচটি সরকারি কোম্পানি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা মুনাফা বিতরণ করেছে। এর মধ্যে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি দিয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি দিয়েছে ২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ইলেক্ট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ দিয়েছে ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। রুরাল পাওয়ার কোম্পানি দিয়েছে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং বি-আর পাওয়ারজেন দিয়েছে ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর বাইরে সরকারের গ্যাস কোম্পানি ও যৌথ উদ্যোগের কোম্পানিও রয়েছে। তবে যৌথ উদ্যোগের কোম্পানিগুলোর মুনাফা এখনো বণ্টন করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সরকারের অধীনে থাকা এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠান লাভ-লোকসানের হিসাবে পড়ার কথা নয়, কারণ তাদের কাজ জনগণকে সেবা দেওয়া। তাঁর ভাষ্য, কোম্পানিগুলো বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করছে বলেই সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। আবার একই কোম্পানি প্রফিট বোনাস দিচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সত্যিই মুনাফা করলে তাকে ভর্তুকি দেওয়ার যুক্তি থাকে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি এটিকে এক ধরনের লুণ্ঠন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, এর দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই চাপছে। তিনি আরও জানান, প্রতিবাদের পর অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রফিট বোনাস বন্ধ হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিংয়ের কথা বলেন, যেখানে এখন আর এই বোনাস দেওয়া হয় না।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এই চর্চা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। তিনি বলেন, একদিকে কোম্পানিগুলো লোকসানের কথা বলে ভর্তুকি নিচ্ছে, অন্যদিকে কর্মীদের বোনাস দিচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। জনগণের করের টাকায় ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, আবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সেই অর্থই জনগণের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। তিনি সরকারকে বিষয়টি চিহ্নিত করে বন্ধ করার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, অতীতের সরকারগুলোও একই কাজ করেছে এবং এখনো সেই ধারা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের আমলে এই লুটপাটের সূচনা হয়েছিল এবং বহু সমস্যা রেখে যাওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি সারা গায়ে ব্যথা হলে ওষুধ কোথায় দেওয়া হবে, এমন অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেন। শুধু বিদ্যুৎ নয়, অন্য কোম্পানির বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে বিষয়টি রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব সামনে এনেছে। একদিকে সরকার ঘাটতি মেটাতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছে। অন্যদিকে সেই সহায়তা হিসাবে ঠিকভাবে না ধরায় কাগজে-কলমে মুনাফা দেখানো হচ্ছে এবং তার একটি অংশ যাচ্ছে বোনাস হিসেবে। এতে ভর্তুকির উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। পাশাপাশি শ্রম আইনের বাধ্যবাধকতা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনার মধ্যে সংঘাত দেখা দিয়েছে। এই জটিলতা কাটাতে হলে ভর্তুকির অর্থ কোম্পানির হিসাবে কীভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রয়োজন। না হলে ভর্তুকির বোঝা বাড়তেই থাকবে, আর এর চাপ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের গ্রাহকদেরই বহন করতে হবে।

