কূটনীতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য রাখা শুল্কমুক্ত মদ আমদানির সুযোগ নিয়ে বড় ধরনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই সুবিধায় আনা মদের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিদেশিদের নামে আনা মদের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে সাধারণ বারগুলোতে। এতে সরকার প্রতিনিয়ত বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাংলাদেশে অবাধে মদ আমদানির সুযোগ নেই। উচ্চ শুল্ক দিয়ে শর্তসাপেক্ষে এটি আমদানি করা যায়। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রটোকলের অংশ হিসেবে বিদেশি কূটনীতিক ও প্রিভিলেজ পারসনদের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ আনার সুযোগ রেখেছে সরকার। এই সুবিধার আওতায় আমদানির পরিমাণ হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫৫৫ লিটার শুল্কমুক্ত মদ আমদানি হতো। ২০২৬ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৭১ লিটারে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই সুবিধায় আমদানি হয়েছে ৯ লাখ লিটারের বেশি মদ। বছর শেষে এ পরিমাণ ১২ লাখ লিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এক বছরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা এত বাড়ল কীভাবে এবং এই মদ আসলে কারা পান করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এই অপব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে। সম্প্রতি এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে গুলশানের একটি বার থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ জব্দ করা হয়েছে। এর বাইরে গুলশানের একটি ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসেও অভিযান চালান গোয়েন্দারা। নানা অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউস সিলগালা করা হয়েছে। অথচ এর মধ্যেই নতুন করে ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অনুমোদন পেতে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান এনবিআরে তদবির চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান জানান, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অবৈধভাবে আসা মদ জব্দ করা হয়েছে। সরকারের শুল্ক-কর ফাঁকি বন্ধে এই অভিযান চলবে। যাঁরা নিয়ম না মেনে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস হলো বিশেষভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত গুদাম। বিদেশি কূটনীতিক ও প্রিভিলেজ পারসনদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় মদ, বিয়ার, সিগারেটসহ ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করাই এর কাজ। এই পণ্যের ভোক্তা হওয়ার কথা বিদেশি কূটনীতিক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের। এনবিআরের অনুমোদন নিয়ে দেশের পাঁচটি বেসরকারি কোম্পানি এই ব্যবসা করছে। গত বছর এই পাঁচ কোম্পানিকে ৪৬ লাখ ডলারের মদ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
শুল্কের হিসাবটি এই অপব্যবহারের প্রলোভন কতটা বড়, তা বোঝায়। সাধারণত এক টাকার মদ আমদানিতে গড়ে ছয় টাকা শুল্ক-কর দিতে হয়। এনবিআরের নিয়মে বিশেষ করে হুইস্কি ও ভদকার ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ৬৩৬ শতাংশ। কিন্তু ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো এই মদই শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনে। ফলে শুল্কমুক্ত মদ খোলাবাজারে বিক্রি করলে মুনাফার পরিমাণ অনেক বেশি হয়।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি প্রাপ্যতা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। অথচ মদ কারা পান করছেন, তাঁদের সঠিক সংখ্যা এনবিআরের কাছে নেই। স্বচ্ছতা আনতে তিন বছর আগে একটি সফটওয়্যার চালু হয়েছিল। ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট কোম্পানিগুলো দেখভাল করলেও সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ এনবিআরের হাতে। ফলে সফটওয়্যারে হিসাব থাকলেও তার যথার্থতা নিয়ে খোদ কর্মকর্তারাই সন্দিহান। আইনি ফাঁকফোকরের কারণে অপব্যবহার আদতে বন্ধ হচ্ছে না বলেও তাঁরা মনে করেন।
আরেকটি বড় ফাঁকের কথা বলছেন কর্মকর্তারা। প্রতিটি কূটনৈতিক বা প্রিভিলেজ পাসপোর্টের বিপরীতে মাসে ২০০ ডলার করে আমদানি প্রাপ্যতা দেওয়া হয়। এখানে মদের ট্যারিফ ভ্যালু ধরা হয়েছে মাত্র ৫ ডলার। এই হিসাবে একজন প্রিভিলেজ পাসপোর্টধারী মাসে প্রায় ৪০ লিটার বা বোতল মদ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনতে পারেন। একজন মানুষ ত্রিশ দিনে এত মদ পান করেন কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার একজন বিদেশির পোশাক, ব্যবহার্য সামগ্রী ও খাবারসহ সব খরচ একসঙ্গে ধরে ডলারে প্রাপ্যতা দেওয়া হয়। পরিমাণের বদলে ডলারে প্রাপ্যতা দেওয়ায় মদের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের সুযোগ আরও বাড়ছে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, পরিমাণের বদলে ডলারে প্রাপ্যতা নির্ধারণই সবচেয়ে বড় ফাঁকি। পাসবুক নিয়েও অনিয়মের সুযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অসাধু ব্যক্তিরা বিদেশিদের পাসপোর্ট ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত মদ আনে। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিদেশিদের নাম ব্যবহারের সুযোগ নেওয়া হতে পারে। তাঁর পরামর্শ, মদের জন্য আলাদাভাবে ডলার বা পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিলে অপব্যবহার কমতে পারে। শুল্কমুক্ত মদ খোলাবাজারে যাওয়া ঠেকাতে ব্যবহারকারীদের সঠিক পরিসংখ্যান থাকা জরুরি। ডলারে প্রাপ্যতা দেওয়ার নিয়মেও নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার ড. নাহিদা ফরিদী বলেন, তাঁদের মূল কাজই অবৈধ আমদানি যুক্তিসংগত পর্যায়ে কমিয়ে রাখা। ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার এবং শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধ করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা পাবে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি রাজস্ব ব্যবস্থার একটি গুরুতর দুর্বলতা সামনে এনেছে। কূটনৈতিক সুবিধা আন্তর্জাতিক সৌজন্যের অংশ, কিন্তু তা যদি খোলাবাজারের মুনাফার পথ হয়ে ওঠে, তাহলে সরকারের রাজস্ব যেমন হারায়, তেমনি আইনসম্মতভাবে শুল্ক দিয়ে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোও অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে। অভিযান জরুরি, কিন্তু তা একা যথেষ্ট নয়। প্রাপ্যতা নির্ধারণের পদ্ধতি বদলানো, সফটওয়্যারের তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রকৃত ব্যবহারকারীর তালিকা রাখার মতো কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই ফাঁক বন্ধ করা কঠিন হবে। উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ এনবিআরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

