অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে ঋণ, অনুদান এবং কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু ঋণের সুদহার বাড়ায় নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয় এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে সুদের হারের পরিবর্তন সরকারের সামগ্রিক ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সব জাপানি ঋণের সুদ একই নয়; ঋণের ধরন, চুক্তির সময় এবং অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী হার ভিন্ন হয়ে থাকে।
কীভাবে বাড়ল জাপানি ঋণের সুদ
বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। এরপর থেকে জাপান উন্নয়ন সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাপানের প্রতিশ্রুত সহায়তার মধ্যে ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং অনুদান ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
২০১৫ সালে ছয়টি প্রকল্পের জন্য জাপানের সঙ্গে ১ হাজার ৩৩২ কোটি ৬৫ লাখ ইয়েনের ঋণচুক্তি হয়েছিল। এসব ঋণের বার্ষিক সুদহার ছিল ০.০১ শতাংশ, পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর এবং রেয়াতকাল ১০ বছর।
এরপর বাংলাদেশের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ঋণের শর্ত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কিছু ঋণের সুদহার বেড়ে ০.৭ শতাংশ হয়। ২০১৮ সালে নতুন ঋণ প্যাকেজে তা ১ শতাংশে উন্নীত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঋণ প্যাকেজে সুদহার আরও বেড়েছে। ২০২০ সালে ঋণের ধরন ও ঋণগ্রহীতার শ্রেণিভেদে সুদহার ছিল ০.৭ থেকে ১.২ শতাংশ। ২০২২ সালে কিছু ঋণে তা ০.৭ শতাংশ এবং অন্য প্যাকেজে ১.২ শতাংশ ছিল। ২০২৩ সালে কিছু ঋণের সুদহার ১.৬ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৪-২৫ সালে বিভিন্ন প্রকল্পে সুদহার ছিল ১.৩ থেকে ২ শতাংশ।
এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সাধারণ স্থির সুদহার ৩.০৫ শতাংশ করা হয়। ১ অক্টোবর থেকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৫ শতাংশে।
সব ঋণের শর্ত এক নয়
ইআরডির এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানের উন্নয়ন ঋণে সাধারণত স্থির ও পরিবর্তনশীল—দুই ধরনের সুদহার রয়েছে। তাই সব প্রকল্পের ঋণ ৩.৫ শতাংশ সুদে নেওয়া হয়েছে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
স্থির সুদের ঋণে চুক্তির সময় নির্ধারিত হার সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে। অন্যদিকে, পরিবর্তনশীল সুদের ঋণের ব্যয় বাজারের নির্দিষ্ট ভিত্তি হারের সঙ্গে ওঠানামা করতে পারে। এ ধরনের ঋণে প্রযোজ্য অতিরিক্ত সুদও চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে ১০ বছরের রেয়াতকালসহ ৩০ বছর মেয়াদে পরিশোধের সুযোগকে গুরুত্ব দেয়। তবে ঋণের মেয়াদ, রেয়াতকাল এবং সুদের হার একসঙ্গে বিবেচনা করেই প্রকৃত অর্থায়ন ব্যয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর ঋণের শর্ত
জাপানের পাশাপাশি বাংলাদেশ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, চীন ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের মতো বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়ন পেয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের শর্তও এক নয়।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কিছু সহজ শর্তের ঋণে রেয়াতকালে ১ শতাংশ এবং মূল ঋণ পরিশোধের সময়ে ১.৫ শতাংশ সুদ দিতে হয়। অন্য কিছু ঋণে সুদহার ২ শতাংশ। এসব ঋণের মেয়াদ সাধারণত ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছরের রেয়াতকাল রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার ঋণ এবং পুনর্গঠন ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক ব্যাংকের ঋণের শর্তও আলাদা। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কিছু ঋণের সুদহার ২ শতাংশ এবং মেয়াদ ৪০ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের কিছু ঋণে সুদহার ২ শতাংশ, পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর এবং রেয়াতকাল পাঁচ বছর।
অন্যদিকে, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১ থেকে ১.৪৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে বলে ইআরডির তথ্য উল্লেখ করেছে। এসব ঋণের মেয়াদ ১৮ থেকে ৩৫ বছর এবং রেয়াতকাল তিন থেকে সাত বছর হতে পারে।
তবে এসব হার সব ঋণের জন্য প্রযোজ্য নয়। ঋণের ধরন, বাজার পরিস্থিতি, চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে প্রকৃত সুদহার ও পরিশোধের দায় নির্ধারিত হয়।
সহজ শর্তের ঋণ কমার পেছনে কী কারণ
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমেছে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা জোরদার করা, যাতে ঋণের সুদহার ও অন্যান্য শর্ত যতটা সম্ভব অনুকূল রাখা যায়।
তিনি বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঋণের শর্ত নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে অর্থায়ন সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণের সুদহার গড়ে ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি।
বড় প্রকল্পে অর্থায়নের বিকল্প সীমিত
বাংলাদেশের জন্য শুধু কম সুদের ঋণ খোঁজাই যথেষ্ট নয়; কোন প্রকল্পে কোন অর্থায়ন সবচেয়ে উপযোগী, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। কিছু প্রকল্প নির্দিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা সহজ নয়।
উদাহরণ হিসেবে মেট্রোরেল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাপানের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সীমিত হতে পারে। তাই সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দর-কষাকষি চালিয়ে যেতে হবে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহ করলে কোনো একক অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে এবং ভবিষ্যতে অর্থায়নের শর্ত নিয়ে আলোচনার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
জাপানের সহায়তায় এখনো চলছে ৭৩টি প্রকল্প
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার আওতায় বাংলাদেশে ৭৩টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে ২৪টি ঋণসহায়তাপুষ্ট, ৯টি অনুদানসহায়তাপুষ্ট, ৩৭টি কারিগরি সহযোগিতার এবং তিনটি ডিআরজিএ-সিএফ প্রকল্প।
এসব প্রকল্পের মধ্যে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বন্দর, যমুনা রেল সেতু এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উল্লেখযোগ্য।
জাপানের ঋণের সুদহার বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয় নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে পুরোনো ঋণচুক্তির সুদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন হারে বেড়ে যায় না। ফলে প্রকৃত আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে প্রতিটি ঋণচুক্তির শর্ত, সুদের ধরন, পরিশোধের মেয়াদ এবং অবশিষ্ট ঋণের পরিমাণ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তের অর্থায়ন ধরে রাখা, বিকল্প উৎস বাড়ানো এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর দর-কষাকষি ভবিষ্যৎ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

