বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় রূপান্তর করতে ২০২৫ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিশ্চিত অর্থায়ন রয়েছে মাত্র ১৬০ কোটি ডলারের মতো। আরও ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন। ফলে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার, যা মোট চাহিদার প্রায় ৭৩ শতাংশ। অর্থায়নের এই সংকট কাটানো না গেলে কারখানার জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, দূষণ কমানো এবং পরিবেশগত মান উন্নয়নের উদ্যোগ পিছিয়ে পড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর ঢাকার গুলশানে ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সবুজ অর্থায়নের সুযোগ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। লাইটক্যাসলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক উৎপাদন খাতের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন।
এই বিনিয়োগের প্রয়োজন শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। অন্যদিকে বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পরিবেশগত মান, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার বিষয়ে ক্রমেই বেশি নিশ্চয়তা চাইছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে পরিবেশ ও টেকসই উৎপাদনসংক্রান্ত বিধিবিধানও কঠোর হচ্ছে। ফলে এখন শুধু কম দামে ভালো পণ্য তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, পণ্যটি কতটা পরিবেশবান্ধব উপায়ে তৈরি হচ্ছে, সেটিও ব্যবসার প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গবেষণায় সবুজ বিনিয়োগের কয়েকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রও চিহ্নিত করা হয়েছে। কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এলইডি বাতি ব্যবহার, শিল্পপ্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ পুনর্ব্যবহার এবং জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতি স্থাপন এর মধ্যে রয়েছে। এসব উদ্যোগে প্রাথমিক পর্যায়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি খরচ কমানো এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করার সুযোগ তৈরি হয়। অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের গবেষণাতেও বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্র খাতের কার্বন নিঃসরণ কমাতে ৬৬০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও সব কারখানা তা পাচ্ছে না। বড় ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো জামানত, ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতার কারণে তুলনামূলক সহজে ঋণ পায়। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল আর্থিক সক্ষমতা এবং পরিবেশগত মান পূরণে সীমাবদ্ধতার কারণে তারা অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়ে। এখানে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। পরিবেশগত মান উন্নত করতে কারখানার অর্থ প্রয়োজন, আবার সেই মান পূরণ না হলে অর্থায়ন পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়। এ ছাড়া অনেক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগে। কিন্তু ঋণের মেয়াদ কম হলে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চাপ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসান খালেদ ফয়সাল সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। আলোচনায় ঋণ পাওয়ার শর্ত ও আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, সরকারি নিশ্চয়তার ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পমালিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রস্তাব উঠে আসে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য শুধু ঋণ নয়, প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রধান ব্যবসা পরামর্শক শৌমিক শাহরিয়ার অর্থায়নের ঘাটতি, ঋণ পাওয়ার বাধা এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। আলোচনায় জালো নিটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরিয়া লোপেজ, সিটি ব্যাংকের মোল্লা করিমুল ইসলাম তুহিন, আইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক, শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের তাইফ হোসেন এবং ব্র্যাক ব্যাংকের তাশমীম মুনতাজির চৌধুরী অংশ নেন। ‘অপরাজিতা ফেজ টু’ কর্মসূচির আওতায় ‘বুনন ২০৩০’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়। এর লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পোশাকশিল্প গড়ে তোলার পাশাপাশি এ খাতের নারী শ্রমিকদের জীবিকা ও কল্যাণ সুরক্ষিত রাখা।

