সব সূচকে নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। এটি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সূচক শক্তিশালী থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনীতির দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো সময় বাড়ানোর আবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ সফলভাবে মানদণ্ড পূরণ করেছে। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি মূল্যায়নে, অর্থাৎ ছয় বছর ধরে মানদণ্ড পূরণ করলে তাকে এলডিসি তালিকা থেকে বের করা হয়। সেই হিসাবে ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের তালিকা ছাড়ার কথা ছিল। তবে কোভিড পরিস্থিতির কারণে প্রস্তুতির সময় বাড়ানো হয়। ফলে উত্তরণের সময় ঠিক হয় ২০২৬ সালের নভেম্বর।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের অবস্থান যে বেশ শক্তিশালী, তা তুলে ধরেন সিপিডির এই ফেলো। তাঁর হিসাবে, মাথাপিছু জাতীয় আয়ে (জিএনআই) বাংলাদেশ নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ এগিয়ে ছিল। মানবসম্পদ সূচকে এগিয়ে ছিল ১৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে অবস্থান ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ ভালো। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে। জাতিসংঘের ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনকারী অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সময় বাড়ানোর প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবকে চিঠি লিখে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় চান। সব সূচকে এগিয়ে থাকার পরও বাংলাদেশকে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা ব্যতিক্রমী। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও বাড়তি সময় চেয়েছিল এবং দুই দেশকেই তা দেওয়া হয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির (সিডিপি) নিয়মে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সরাসরি উত্তরণের সময় বাড়ানোর কারণ হিসেবে গণ্য হয় না। তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময় অর্থনীতিতে যেসব জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এসব কারণে অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল হয়েছে এবং বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতাও কমেছে। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে চিঠি দেওয়ায় বিষয়টি শুধু আমলাতান্ত্রিক বা কারিগরি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মাধ্যমে সরকার পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক দায়িত্ব ও মালিকানা গ্রহণ করেছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থানও তুলে ধরেন দেবপ্রিয়। তাঁর ভাষ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্য দেশগুলো আবেদনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। অন্যদিকে ভেটো ক্ষমতাধর কয়েকটি বড় দেশ এই উদ্যোগের পক্ষে তেমন অবস্থান নেয়নি। নিম্ন-মধ্যম আয়ের কিছু দেশ এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগী কয়েকটি দেশও একটি সফল অর্থনীতিকে বাড়তি সময় দেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি।
সব মিলিয়ে অতিরিক্ত তিন বছর সময় বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতির বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সময় কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। বাণিজ্যসুবিধা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা, অর্থনীতির দুর্বলতা কাটানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলেই এই সুযোগের সুফল পাওয়া যাবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা পরিকল্পিত ও দ্রুত উদ্যোগ নেয়।

