চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধারাবাহিক মন্থরতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। অক্টোবরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়িত আমদানি পণ্যের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বাড়তি আমদানি ব্যয় ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগকে এই পতনের পেছনে দায়ী করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরু থেকেই মাসভিত্তিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে কমছে। জুলাইয়ে বন্দরে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬০১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। আগস্টে তা নেমে আসে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৪ টিইইউতে। সেপ্টেম্বরে আরও কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৩ টিইইউতে। তিন মাসে মোট হ্যান্ডলিং হয়েছে ৮ লাখ ৬৩ হাজার ২৭৮ টিইইউ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ কম।
বন্দরের চারটি সমুদ্রগামী কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে পিসিটি ও এনসিটিতে হ্যান্ডলিং কিছুটা বাড়লেও সিসিটি ও জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) বড় পতন হয়েছে। সিসিটিতে গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১ লাখ ১৩ হাজার টিইইউ হ্যান্ডলিং হয়েছিল। এবার তা নেমেছে ৮৮ হাজার ৫০৪ টিইইউতে, অর্থাৎ কমেছে ২৪ হাজার ৪৯৬ টিইইউ বা প্রায় ২২ শতাংশ। জিসিবিতে পতন আরও বেশি। সেখানে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টিইইউর জায়গায় এবার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৯ টিইইউ। কমেছে ৮৮ হাজার ৯৬৫ টিইইউ বা প্রায় ২৮ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের অক্টোবরে বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ৭৫ লাখ ৪৯ হাজার টন পণ্য শুল্কায়ন করা হয়েছে, যার মূল্য ৪০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ৯১ লাখ ৬৫ হাজার টন এবং মূল্য ৪৫ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে পণ্যের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ, আর মূল্য কমেছে প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
মাসভিত্তিক তুলনাতেও বড় পতন ধরা পড়েছে। সেপ্টেম্বরে কাস্টম হাউসে ৯০ লাখ ৮৩ হাজার টন পণ্য শুল্কায়ন হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৪৮ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। অক্টোবরে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫ লাখ ৪৯ হাজার টনে, মূল্য নামে ৪০ হাজার ৯১১ কোটি টাকায়। এক মাসেই পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্য কমেছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানসূচক ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনীতি এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি উচ্চ। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কম, প্রকৃত আয়ও চাপে। মজুরি সূচকের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও কম। তিনি মনে করেন, সব সূচক মিলিয়ে অর্থনীতি মন্দার দিকেই এগোচ্ছে।
আমদানির ধরন বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্যও রয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি নতুন বিনিয়োগ বা শিল্প সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ, নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর গতি নেই।
বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরেকটি ইঙ্গিত মিলছে ব্যাংক ঋণের তথ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে মাত্র ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। ঋণপ্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্প সুদের এই ঋণ নেওয়ার মতো যোগ্য উদ্যোক্তা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সন্ধ্যায় শুরু হওয়া বৈঠক চলে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। বৈঠকে উপস্থিত ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান জানান, অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি ও প্রণোদনা বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ঋণপ্রবাহ কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও কথা হয়েছে। গভর্নর প্যাকেজ বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে বেশ কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে নতুন কারখানা স্থাপন বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংযোগ মিলছে না। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পে বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন চালানো ব্যয়বহুল। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির চাহিদাতেও।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, সবাই একধরনের আতঙ্কের মধ্যে আছেন। বিনিয়োগ হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা এখন অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখছেন। নতুন সম্প্রসারণে যাবেন, নতুন কারখানা করবেন, নাকি ব্যবসায় পরিবর্তন আনবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পারছেন না।
আমদানি কমার পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও ভূমিকা আছে বলে মনে করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে এবং পণ্য আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দেশের বাজারে ভোগ ও চাহিদা কমায় আমদানির প্রয়োজনীয়তাও কমছে।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও আয় সে হারে বাড়ছে না, তাই ভোগ কমছে। তাঁর হিসাবে, আগে যিনি এক কেজি পণ্য কিনতেন, এখন তিনি কিনছেন ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম। অনেক ক্ষেত্রে ভোগ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ঘাটতি হলো পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুদের অভাব। চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সামলাতে এ ধরনের মজুদ ব্যবহার করে। বাংলাদেশে তা না থাকায় বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি আমদানি ব্যয়, উৎপাদন ও ভোক্তার ওপর পড়ছে।
ইস্পাত খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলীহুসাইন মনে করেন, বিশেষ করে গত দুই মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বেশ মন্থর হয়েছে। তাঁর মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নিলেও বাস্তবায়নে সময় লাগবে, তাই আপাতত চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা কম। মানুষ এখন জরুরি পণ্য কেনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চ মূল্যে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ফলে শিল্পকারখানার ব্যবসা টেকসই রাখা কঠিন হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সংকট আরও বাড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আগাম পরিকল্পনার ওপরও জোর দেন। তাঁর পরামর্শ, ভবিষ্যতে ডলারের সংকট বা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের আশঙ্কা থাকলে এখন থেকেই শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানির জন্য আলাদা পরিকল্পনা বা রেশনিং ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে হঠাৎ আমদানিতে বড় নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন হবে না এবং অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার ঝুঁকিও কমবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, সিমেন্ট খাতের স্থানীয় বা বহুজাতিক কোনো কোম্পানিই এখন ভালো অবস্থায় নেই, সবাই টিকে থাকার লড়াই করছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম অবশ্য বলেন, কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে গতি এসেছে। তবে আমদানি-রপ্তানি বাড়া বা কমা মূলত ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সব মিলিয়ে বন্দর, কাস্টমস ও ব্যাংক ঋণের সূচকগুলো একই দিকে ইঙ্গিত করছে। চাহিদা কমছে, বিনিয়োগে স্থবিরতা বাড়ছে এবং উৎপাদন খাত চাপে রয়েছে। এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

