জ্বালানি তেল, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও বিলাসপণ্যের আমদানিকে কেন্দ্র করে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে সংস্থাটির মোট রাজস্ব সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্য থেকে এই রাজস্ব এসেছে। শুধু অক্টোবর মাসেই আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। তবে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এর চেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। ফলে এই সময়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। পুরো অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।
কাস্টমস কর্মকর্তা শরীফ মো. আল আমিন বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাঁদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। জ্বালানি, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন ধরনের বিলাসপণ্য থেকে রাজস্বের বড় অংশ আসে।
প্রথম চার মাসে রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি তেল আমদানির শুল্ক হিসেবে মোট ৩ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে শুধু অক্টোবর মাসেই দিয়েছে ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ফলে কাস্টমসের রাজস্ব সংগ্রহে জ্বালানি তেল আমদানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এদিকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক পণ্য পরিবহন ও জাহাজ চলাচলে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বন্দরে মোট ১১ লাখ ৪১ হাজার ১৭৯ একক কনটেইনার ওঠানামা করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। তবে এ সময়ে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ মেট্রিক টনে। একই সময়ে বন্দরে ১ হাজার ৪২৫টি জাহাজ ভিড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামিম জানিয়েছেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্য, কনটেইনার ও জাহাজ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ব্যবসায়ীদের মতে, কাস্টমসের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আখতার পারভেজ বলেন, ঢাকার বাবুবাজার এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজারগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লে পণ্য, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বাড়বে। এতে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, ব্যাংকিং লেনদেন ও ঋণপত্র খোলার জটিলতা কিছুটা কমায় বড় পাইকারি বাজারগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও নতুন গতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঋণপত্র খোলা এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতা আরও কমলে ব্যবসায়ীরা আমদানিতে বেশি আগ্রহী হবেন। এর ধারাবাহিকতায় আমদানি বাড়বে এবং কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাজস্ব সংগ্রহে আমদানি কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রথম চার মাসের ঘাটতি পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আগামী মাসগুলোতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার ওপর রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

