ক্যানসার, থাইরয়েডসহ বিভিন্ন জটিল রোগের আধুনিক পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে পাঁচটি স্থানে পরমাণু চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
গত ৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপন করা হবে সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী ও পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে। অন্যটি হবে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর মেয়াদে এর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে সরকার। ব্যয় মেটানো হবে বৈদেশিক মুদ্রায়।
নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হলে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসার প্রয়োজন অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা আধুনিক পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিজেদের কাছাকাছি এলাকায় পাবেন।
যেসব আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে
প্রস্তাবিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে থাকবে পজিট্রন নিঃসরণ ও কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (পিইটি-সিটি), সিঙ্গেল ফোটন নিঃসরণ ও কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (স্পেক্ট-সিটি), সিঙ্গেল ফোটন নিঃসরণ টমোগ্রাফি (স্পেক্ট), হাড়ের খনিজ ঘনত্ব পরিমাপের যন্ত্র, আলট্রাসনোগ্রাম এবং রঙিন ডপলার পরীক্ষা।
এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে থাইরয়েড, কিডনি, যকৃৎ, হাড়, হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসায়ও এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা কাজে আসবে।
প্রকল্পটির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো পরমাণু চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ জনবল তৈরি করা এবং এ বিষয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়ানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের পাশাপাশি চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় পরমাণু চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, জনসংখ্যা ও রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরমাণু চিকিৎসাসেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে থাইরয়েড ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ ধরনের সেবার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
নতুন পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও দক্ষ জনবলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পরমাণু চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে প্রায় ৩০০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ১৩০ থেকে ১৪০ জন।
তাঁর মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এসব যন্ত্র পরিচালনা এবং রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দিতে পর্যাপ্ত দক্ষ চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও কারিগরি কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও মনে করেন, ঢাকার বাইরে পরমাণু চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করা গেলে রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীরা নিজ নিজ এলাকায় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ক্যানসার চিকিৎসা আরও সহজলভ্য করার বৃহত্তর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
একনেকে ১৩ প্রকল্পে ব্যয় ৫৮ হাজার কোটি টাকার বেশি
এদিকে একই দিনের একনেক সভায় মোট ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মিলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ১১টি নতুন এবং দুটি সংশোধিত।
মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৫০ হাজার ৪১ কোটি টাকা, প্রকল্পঋণ ও অনুদান থেকে ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, বরিশাল শহরের খাল পুনরুদ্ধার ও পুনঃখনন, জলবায়ুসহিষ্ণু নগর উন্নয়ন এবং সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনও অনুমোদন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত ও পরিচালনাসংক্রান্ত যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোড আবাসিক এলাকায় সেনা কর্মকর্তাদের জন্য বি-টাইপ আবাসিক ভবন নির্মাণ এবং রাজধানীর জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
জ্বালানি খাতেও নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করা হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়কে ১৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে পরমাণু চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের নতুন উদ্যোগটি দেশের বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবাকে রাজধানীর বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।

