রাজধানীর পাইকারি বাজারে আমদানি করা ফলের যে দাম, খুচরা বাজারে তার চেয়ে গড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশ বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
পুরান ঢাকার বাবুবাজার-বাদামতলী রাজধানীর সবচেয়ে বড় ফলের পাইকারি বাজার। গত শনি ও রোববার সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা মাল্টা কেজিপ্রতি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই দুই দিনে হাতিরপুল, গুলশান, মহাখালী ও কারওয়ান বাজারের দোকানে একই মাল্টার দাম ছিল কেজিতে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ খুচরায় কেজিতে ১৩৫ থেকে ১৬০ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে।
শুধু মাল্টা নয়, আপেল, কমলা, আঙুর ও আনারসহ পাঁচ ধরনের আমদানি করা ফলের দাম বিশ্লেষণ করেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বাদামতলীতে এই পাঁচ ফলের গড় পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ২৯৮ টাকা, খুচরা বাজারে ৪৪১ টাকা। ব্যবধান ৪৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) গত ২৭ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে ফল আমদানিতে শুল্ক-কর বেশি, প্রায় ১২২ শতাংশ। ফলকে বিলাসপণ্য ধরে এই উচ্চ হার আরোপ করা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনেও পাইকারি ও খুচরা দামের ফারাক রয়েছে। সেখানে মাল্টার পাইকারি দর ধরা হয়েছে কেজিতে ২৭৫ টাকা, আর খুচরা দর ৩৭০ থেকে ৪০০ টাকা।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দাম কমাতে শুল্ক-কর কমানোর কথা ভাবছে সরকার। তবে বিশ্লেষকদের মত, শুধু শুল্ক কমালে হবে না। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে এবং শুল্ক কমার সুফল যেন ক্রেতারা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
খুচরা বিক্রেতারা বাড়তি দামের পক্ষে কয়েকটি কারণ দেখান। তাদের ভাষ্য, ২০ বা ১০ কেজির কার্টনে প্রায়ই এক-দুই কেজি ফল কম থাকে। প্রতি কার্টনে ২০ টাকা কমিশন দিতে হয়। এ ছাড়া পরিবহন খরচ ও দোকানভাড়া আছে, ফুটপাতের দোকানে দিতে হয় চাঁদা। ফল পচে নষ্ট হওয়ার ক্ষতিও দামে যোগ হয়। হাতিরপুলের বিক্রেতা আজগর হোসেন বলেন, এসব মিলিয়েই খুচরায় দাম কিছুটা বেশি পড়ে।
তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ প্রতিযোগিতার ঘাটতির কথাও বলছেন। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে ও ভ্রাম্যমাণ ফলের দোকান থাকলেও একটি বাজারের বিক্রেতারা প্রায় একই দাম হাঁকেন। দর-কষাকষিতে কেজিতে বড়জোর ১০ টাকা কমে। কেউ কম দামে বিক্রি করলে অন্যরা তার ওপর চড়াও হন, এমন নজিরও আছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নাজিম উদ্দিন বলেন, খুচরা বিক্রেতারা কম পণ্যে বেশি লাভ করতে চান, তাই কেজিতে তাদের ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাভ ধরতে হয়। তার মতে, ক্রেতারা পাইকারি ও খুচরা দর জানেন না, এটিও একটি সমস্যা। প্রতিদিনের বাজারদর জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে বাড়তি দাম আদায় বন্ধ করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ, বাজারের দৃশ্যমান জায়গায় প্রতিদিনের পাইকারি দরের তালিকা টানানো হোক। কাজটি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর করতে পারে।
উচ্চ শুল্ক-কর, সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার কারণে ফল এখন স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ পুষ্টির জন্য নিয়মিত ফল খাওয়া জরুরি। দেশীয় ফল আছে, তবে চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট নয়। শিশুরা আপেল, মাল্টা ও কমলার মতো ফল বেশি পছন্দ করে। প্রবীণদের অনেকে শারীরিক সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট কিছু ফলই খেতে পারেন।
সূত্র: প্রথম আলো

