পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে অর্থ ও জনবল দিয়ে সহায়তার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সংস্থাটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) দেশের ব্যাংকগুলোকে ইমেইলে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো থেকে অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তরের সুযোগ বন্ধ থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে। এনবিআরের এই পদক্ষেপে দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপের মালিকসহ রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের নাম আসায় বিষয়টি ব্যবসায়ী মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এনবিআর সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক শাহরিয়ার আলম এবং হামিদ গ্রুপের মালিক নসরুল হামিদ বিপুর নাম এসেছে। তালিকায় সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী এবং স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম মোশাররফ হোসেনও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া অ্যাক্সিস নিটওয়্যারসের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু, গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপা, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচি এবং শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের নামও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে তাঁদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এখানে হিসাবের সংখ্যা নিয়েও একটি অসংগতি রয়েছে। কিছু সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও সময়ের আলো ও ডেইলি সানের প্রতিবেদনে অন্তত ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ৩ নভেম্বর এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, বিশেষ কারণে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪টি পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছে। এই তিনটি সংখ্যার মধ্যে সম্পর্ক কী, কিংবা সবগুলো একই অনুসন্ধানের অংশ কি না, সে বিষয়ে এনবিআরের আনুষ্ঠানিক তালিকা বা স্পষ্টীকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে ২০৪ সংখ্যাটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক লেনদেন ও সম্ভাব্য কর ফাঁকির বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে অর্থায়ন, জনবল সরবরাহ কিংবা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করা হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। রাজস্ব বিভাগের কাছে কোনো অর্থের উৎস, মালিকানা কিংবা লেনদেনের ধরন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ ও আর্থিক লেনদেন সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির হিসাব জব্দ হওয়া মানেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২২৩ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে সম্পদ সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তির আয় বা বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য গোপনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের মহাপরিচালক বা সংশ্লিষ্ট কমিশনার লিখিত আদেশের মাধ্যমে অর্থ বা আর্থিক সম্পদ স্থানান্তর কিংবা সরিয়ে নেওয়া বন্ধ করতে পারেন। সাধারণভাবে এ ধরনের আদেশ এক বছর কার্যকর থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনে মেয়াদ আরও সর্বোচ্চ এক বছর বাড়ানো যায়। অন্যদিকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনেও সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করার ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ হিসাব জব্দের ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ নয়, সংশ্লিষ্ট আইনের নির্ধারিত শর্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বোঝাতে সাম্প্রতিক একটি আদালতের রায়ের কথাও উল্লেখ করা যায়। গত ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২২৩ ধারায় এনবিআরের জারি করা কয়েকটি ব্যাংক হিসাব স্থগিতের আদেশ বাতিল করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, হিসাব জব্দের আদেশ দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয় বা বিনিয়োগের তথ্য গোপনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকতে হবে। শুধু পরে তথ্য সংগ্রহ করে আগের আদেশের ভিত্তি তৈরি করা আইনের শর্ত পূরণ করে না। যদিও ওই রায় বর্তমান অনুসন্ধানে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে এনবিআরের ক্ষমতা প্রয়োগে আইনি শর্ত মেনে চলার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
এদিকে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব ২০২৪ সালের পর বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত ও মামলার কারণে আগেই জব্দ করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের কেউ কারাগারে, আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। নতুন নির্দেশনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে কার হিসাব নতুন করে জব্দ করা হয়েছে এবং কার ক্ষেত্রে আগের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পরিষ্কার হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে এনবিআরের এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব স্থগিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক আন্দোলনে অর্থের প্রবাহ কোথা থেকে এসেছে, কোনো ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাতে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনে কর ফাঁকি বা অর্থপাচারের যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিই এখন অনুসন্ধানের বিষয়। তবে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের ভিত্তিতে সাময়িকভাবে অর্থের লেনদেন আটকে রাখা এবং অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে হবে।

