দেশের প্রধান রাজস্ব আহরণকারী শুল্ক স্টেশন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। এই সময়ে ৪২ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও প্রকৃত আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ, দেশের গ্যাস সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতির কারণে রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপও আমদানি কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও তাঁরা নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক ও কর পরিশোধের চেষ্টা করছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের জন্য মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গত অর্থবছরের তুলনায় এই লক্ষ্য প্রায় ২৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। প্রথম চার মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। ফলে বাকি আট মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ১ লাখ ৪ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে।
রাজস্ব আদায়ে প্রধান ভূমিকা রাখছে জ্বালানি তেল, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং অন্যান্য উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা এসব পণ্য থেকেই সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব জমা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, আমদানির পরিমাণ এবং ডলারের বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন রাজস্ব আদায়ে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একইভাবে বিলাসবহুল গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের আমদানি কমে গেলে শুল্ক আদায়ও কমে যায়। ঋণপত্র খোলার জটিলতা তৈরি হলেও আমদানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্য থেকে ২৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে শুধু অক্টোবর মাসে এসেছে ৫ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। তবে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এর চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কর্তৃপক্ষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত জ্বালানি, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য উচ্চ শুল্কযুক্ত ভোগ্যপণ্য থেকে বেশি রাজস্ব আসছে।
তিনি আরও জানান, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন থেকে জ্বালানি তেল আমদানির শুল্ক বাবদ সবচেয়ে বেশি রাজস্ব পাওয়া গেছে। চার মাসে প্রতিষ্ঠানটি থেকে আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু অক্টোবর মাসেই এসেছে ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।
গত কয়েক অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে প্রতিবছরই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিষ্ঠানটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায় ছিল ৬৮ হাজার ৬৬৬ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। পরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৫০২ দশমিক ৪১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় আরও বেড়ে ৮১ হাজার ৪৭১ দশমিক ৩৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
সর্বশেষ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছিল ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। ফলে ওই বছরও ঘাটতি ছিল ২০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ, ধরন এবং শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের ওপর রাজস্ব আদায় অনেকাংশে নির্ভর করে। আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং যথাযথভাবে শুল্কায়ন নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
তবে তাঁর মতে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম মনে করেন, শুধু জ্বালানি তেল ও কয়েকটি উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঋণপত্র খোলা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের জটিলতা কমানো গেলে ব্যবসায়ীরা আমদানিতে আরও আগ্রহী হবেন। পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রম দ্রুত ও সহজ করা গেলে পণ্য আমদানি বাড়বে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে রাজস্ব আদায়ে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আকতার পারভেজও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ঢাকার বাবুবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজারগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়ানো গেলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে বন্দরে পণ্য ওঠানামা, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজ আসার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে বন্দরের মাসিক রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে। গত বছর একই সময়ে কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে থাকলেও চলতি বছর পণ্য ওঠানামা ও জাহাজ আগমনের ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি হয়েছে।
তবে প্রথম চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ১১ লাখ ৪১ হাজার ১৭৯টি ২০ ফুট সমতুল্য কনটেইনার পরিচালনা করা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। অন্যদিকে পণ্য ওঠানামা ও জাহাজ আগমনের পরিসংখ্যানে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে। এই সময়ে বন্দরে মোট ৪ কোটি ৫৩ লাখ মেট্রিক টন পণ্য ওঠানামা করেছে এবং ১ হাজার ৪২৫টি জাহাজ ভিড়েছে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি ফেরানো, ব্যাংকিং জটিলতা কমানো এবং বন্দরের কার্যক্রম আরও দক্ষ করা গেলে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

