যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার এ চিত্র তুলে ধরেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
তিনি জানান, চীনের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। অন্যদিকে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্র।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে ওই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৬২৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানির তুলনায় আমদানি দ্রুত বাড়ায় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমেছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই অগ্রগতি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা আমদানি শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য পাল্টা শুল্ক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরির বিষয়েও সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও জ্বালানিসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য কেনার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ।
জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান
রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের আয়োজনে ৩০তম যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন তিনি।
স্পিকার জানান, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। দেশের জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা নিয়েও তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
নিজের নির্বাচনী এলাকা ভোলার একটি দ্বীপে গ্যাসের মজুতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানে সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের মজুত প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান চালালে তেল ও গ্যাসের নতুন মজুত আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী মিয়ানমারের আবিষ্কারের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর করতে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক দিয়ে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কাজ করছে। মার্কিন কোম্পানিগুলো যেন শুধু বিনিয়োগই না করে, বাংলাদেশে উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু করতে পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুমতিপত্র ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র পেতে যে জটিলতা রয়েছে, তা কমাতে একক সেবা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার সময় কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়লে সরকার সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ব্যবসার সুযোগ বাড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দেশটির রপ্তানি সম্প্রসারণ করা।
তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কাঠামো তৈরি করেছে। তবে চুক্তির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে এর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
এ জন্য সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, সময়মতো অর্থ পরিশোধ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ছাড়া শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা ও বাস্তবায়নের বিষয়টিও উল্লেখ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তাঁর মতে, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হলে ব্যবসায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ আরও ন্যায্য হবে এবং বাংলাদেশ দায়িত্বশীল বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাঁচ বছরে আরও ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি জানান, বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। গত ১১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংগঠনটি।
তবে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সদস্যসংখ্যা ২৭০। দেশের মোট কর রাজস্বের প্রায় ২২ শতাংশে এই সংগঠনের সদস্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান রয়েছে।
তিন দিনব্যাপী ৩০তম যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য মেলা ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে চলবে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস যৌথভাবে এ আয়োজন করেছে। প্রায় আড়াই বছর বিরতির পর আবারও এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
এবারের আয়োজনে ৪৩টি প্রদর্শক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি কোম্পানি এবং সাতটি নতুন উদ্যোগ রয়েছে। মোট ৬৩টি প্রদর্শনী স্টলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা তুলে ধরা হচ্ছে।
অংশগ্রহণকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাটারপিলার, শেভরন, এক্সনমোবিল, মেটলাইফ, সিটিগ্রুপ, মাস্টারকার্ড, ভিসা, কোলগেট-পামোলিভ, ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল, পেপসিকো, কস্টকো, পিপিজি, ইউপিএস ও কারগিল।
মেলায় মার্কিন পণ্যের প্রদর্শনী, ঐতিহ্যবিষয়ক আয়োজন এবং নতুন উদ্যোগের জন্য পৃথক অঞ্চলসহ মোট সাতটি বিশেষ প্রদর্শনী অঞ্চল রাখা হয়েছে।

