করোনাপূর্ব সময়ের পর থেকে দেশে আসবাবের বিক্রি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানান উৎপাদকেরা। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত খরচের খাত হিসেবে আসবাব কেনা তারা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
উৎপাদকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, আবাসন খাতের মন্দা এবং সস্তা আমদানি করা পণ্যও চাহিদা কমিয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল, শ্রমিক মজুরি, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন উপকরণের খরচ বাড়ায় চাপ আরও বেড়েছে।
জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হাতিল ফার্নিচারের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ, স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি আর নেই। তিনি জানান, শিল্পটি এখন সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি পার করছে এবং অনেক ব্র্যান্ড আগের তুলনায় মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পরিমাণ পণ্য বিক্রি করতে পারছে। তার ভাষ্য, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ভালো ছিল, যখন স্থানীয় উৎপাদকেরা বিদেশে সুযোগ খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, মানুষের পকেটে এখন যথেষ্ট টাকা নেই, আর এটিই মূল সমস্যা।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আসবাবের বাজারের আকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। হাতিলের মতো প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড সারা দেশে ৪০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প কারখানার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। বাংলাদেশ ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফআইওএ) তথ্যমতে, ব্র্যান্ডবিহীন এসব প্রস্তুতকারকই স্থানীয় বাজারের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে।
২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বর্তমান ধাক্কা তীব্র আকার নেয়। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে, অথচ মজুরি প্রবৃদ্ধি তার নিচেই থেকেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ এবং প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে শীতকালে দেশীয় বাজারে সাধারণত যে বাড়তি বিক্রি দেখা যায়, তা কিছুটা ম্লান হতে পারে। এ সময় অনেক বিয়ের অনুষ্ঠান হয় এবং পরিবারগুলো নতুন কেনা অ্যাপার্টমেন্টে উঠে ঘর সাজাতে আসবাব কেনে।
সেলিম বলেন, কম ক্রেতা নিয়ে খরচ সামলাতে উৎপাদকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। তবে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য নিয়মিত খরচ মেটাতে হয় বলে তারা সহজে উৎপাদন কমাতে বা কারখানা বন্ধ করতে পারেন না। তার কথায়, মুনাফা কম হলেও ব্যবসা চালু রাখতেই হবে, এ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আসবাব মেলা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বলে জানান সেলিম। তার ভাষ্য, মেলায় ভালো সংখ্যক দর্শনার্থী এসেছেন এবং অংশগ্রহণকারীরা অর্ডার ও বুকিং পেয়েছেন। তবে ব্র্যান্ডবিহীন বেশির ভাগ উৎপাদক এই সুবিধার সুফল তেমন পাননি।
ঢাকার মিরপুরের বেগম রোকেয়া সরণিতে অবস্থিত ব্র্যান্ডবিহীন বৃহত্তম শোরুমগুলোর একটি আলতাফ ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী আলতাফ হোসেন বলেন, ক্রেতারা খরচে অনাগ্রহী থাকায় বিক্রি এখনো ঘুরে দাঁড়ায়নি। তার মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মৌলিক প্রয়োজনের বাইরে পরিবারগুলোর হাতে তেমন কিছু থাকছে না, ফলে অনেকে আসবাব কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। তিনি জানান, গত তিন বছরে কাঁচামাল, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ায় আসবাবের দাম বেড়েছে, কিন্তু চাহিদা দুর্বল থাকায় আর দাম বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আলতাফ জানান, শোরুমের ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, ইউটিলিটি বিলসহ অন্যান্য খাতে তার মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। গত তিন বছরের খারাপ বিক্রিতে তার ব্যবসা ক্রমেই চাপে পড়ছে। তার ভাষ্য, বর্তমান ব্যবসার পরিবেশ মোটেই অনুকূল নয়; দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পর মানুষের হাতে খুব কম টাকা থাকে, তাই তারা এখন আসবাবে খরচ করতে চান না।
আরেকটি বড় ব্র্যান্ড নাদিয়া ফার্নিচার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ করিম মজুমদার বলেন, মন্দার কারণে পরিবারগুলো অত্যাবশ্যকীয় খরচে মনোযোগ দেওয়ায় আসবাব তাদের অগ্রাধিকার তালিকার নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, হাতে বাড়তি টাকা থাকলেই মানুষ আসবাব কেনে, কিন্তু এখন সেই টাকা নেই,আসবাব কেনা প্রায় বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম জানান, যারা আগে ১০০ টাকার আসবাব বিক্রি করতেন, তারা এখন বিক্রি করছেন মাত্র ৭০ টাকার মতো।
এরপরও উৎপাদকেরা বলছেন, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে-এই আশায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের হাতে বিকল্প নেই।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

