দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলাকে আধুনিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে সরকার। বন্দরের পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে নির্মাণ করা হবে দুটি আধুনিক জেটি। পাশাপাশি তৈরি করা হবে কনটেইনার সংরক্ষণের জায়গা এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। আজ ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা থাকলেও মোংলা বন্দর এখনো বড় আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। পশুর চ্যানেলে নাব্যতা সংকট এবং বন্দরের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।
নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো বন্দরে দুটি আধুনিক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জেটি তৈরি হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে কনটেইনার সংরক্ষণাগার। এসব সুবিধা চালু হলে বছরে প্রায় ৪ লাখ একক কনটেইনার পরিবহনের অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটিতে ২৯ হাজার ৭০০ একক কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি। বর্তমানে বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য পাঁচটি জেটি রয়েছে। এসব জেটি মূলত খোলা পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হলেও কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজও করা হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রকল্পের আওতায় বন্দরে ৪৯টি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। এসব যন্ত্রের সাহায্যে প্রতি ঘণ্টায় ৩০টির বেশি কনটেইনার ওঠানো-নামানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিপজ্জনক পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও তৈরি করা হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের বার্ষিক পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বেড়ে দেড় কোটি টনে পৌঁছাবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে ১ কোটি ২২ লাখ টন পণ্য ওঠানো-নামানো হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই পরিমাণ ১৮ শতাংশ বেশি।
প্রকল্পটির অধিকাংশ অর্থায়ন করবে চীন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া যাবে। বাকি অর্থের জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় গত ২৫ জুন চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্পটির প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করবে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
এদিকে চীনের রেলওয়ে নির্মাণ করপোরেশনের চেয়ারম্যান দাই হেগেনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। বৈঠকে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং দুই দেশের বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও চায়না রেলওয়ে নির্মাণ করপোরেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বন্দরটির কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে শুধু নতুন জেটি নির্মাণই যথেষ্ট নয়। পশুর চ্যানেলের নাব্যতা বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে পাঁচ বছর মেয়াদি খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। চ্যানেলের বিভিন্ন অংশে নিয়মিত খননের মাধ্যমে সারা বছর জাহাজ চলাচলের উপযোগী গভীরতা বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে বন্দরের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো পণ্য পরীক্ষার জন্য স্ক্যানার সুবিধা না থাকা। সমুদ্র থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত এই বন্দরে স্ক্যানার না থাকায় পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, আমদানি-রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়তা করবে এই বন্দর।
তাঁর মতে, সম্প্রসারিত অবকাঠামো চালু হলে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এতে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মোংলার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে এই বিনিয়োগের সুফল পেতে বন্দরে আরও বেশি পণ্য ও জাহাজ আনতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা এবং সারা বছর নৌপথের নাব্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল ছিল ৩ দশমিক ৪৪ দিন। ওই সময়ে ১২ হাজার আমদানি করা পুরোনো গাড়ি খালাস হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি।
নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে প্রকল্পের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে আধুনিক সুবিধার যথাযথ ব্যবহার, নাব্যতা রক্ষা এবং বন্দরের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর।

