পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং বিকল্প অর্থ পরিশোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখিয়েছে মস্কো। বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়েও আগ্রহ রয়েছে দেশটির।
রাশিয়ার এই উদ্যোগের পেছনে অন্যতম কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধে তৈরি হওয়া জটিলতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের জন্য সোনালী ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ নিষেধাজ্ঞার কারণে সংশ্লিষ্ট রুশ ব্যাংকে পাঠানো যাচ্ছে না।
এর আগে বাংলাদেশে রুশ ব্যাংকের শাখা খোলা, ভারতীয় রুপিতে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তি এবং নিজস্ব অর্থ পরিশোধ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নথি অনুযায়ী, রাশিয়ার রপ্তানি কেন্দ্র গোষ্ঠীর আওতাধীন এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে এবং বিকল্প অর্থ পরিশোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় বাধা রয়েছে। এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া এবং এর মূল প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টার—দুটিই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সরাসরি সহযোগিতার ক্ষেত্রে আইনি ও আর্থিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ ১৩৬ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে।
জ্বালানি, সার ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে রাশিয়া দীর্ঘদিনের অংশীদার। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে দেশটি।
এ ছাড়া ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম। ভোলায় প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েকটি কূপ খনন করেছে।
সর্বশেষ বৈঠকে দুই পক্ষ তেল ও গ্যাস খাত, শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং রূপপুর প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বৈঠকের নথিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন সংস্থা ভিইবি.আরএফ এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাবও রয়েছে। এর লক্ষ্য তথ্য বিনিময় এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানো।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করতে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন এবং রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
মতিঝিলে ফেডারেশনের কার্যালয়ে বাংলাদেশ-রাশিয়া ব্যবসায়িক সংলাপের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
এই সমঝোতার আওতায় দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রকল্প গ্রহণ, বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনী আয়োজন, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল বিনিময় এবং বিনিয়োগবিষয়ক সভার মাধ্যমে অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংলাপে অংশ নেওয়া দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা বিদ্যমান বাণিজ্যিক বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে টেকসই অর্থ পরিশোধব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তাঁরা।
নিষেধাজ্ঞাজনিত ব্যাংকিং জটিলতা দূর করে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

