বিশ্ববাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তবে শুধু চুক্তি সম্পাদন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এর জন্য দেশের বাণিজ্যনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ব্যবসার পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ‘বৈশ্বিক সংকট, অর্থনৈতিক সংযুক্তি এবং বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি’ শীর্ষক এই সেমিনারের যৌথ আয়োজক ছিল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এবং ফ্রিডরিখ এবার্ট স্টিফটাং বাংলাদেশ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচলিত কাঠামোয় পরিবর্তন আসছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বহুপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশল নতুনভাবে সাজাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় অর্থনৈতিক অংশীদারের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য খাতে রপ্তানি বাড়ানো, উন্নত প্রযুক্তি আমদানি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন। দক্ষ আলোচক তৈরি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা।
সেমিনারে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বহুপক্ষীয় আলোচনা যখন ধীরগতিতে এগোচ্ছে, তখন দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা তৈরি করছে। এসব পরিবর্তন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাণিজ্য কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যৌক্তিক হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ শ্রমনির্ভর শিল্পপণ্য রপ্তানিতে তুলনামূলক সুবিধা ভোগ করে। অন্যদিকে উন্নত অর্থনীতিগুলো থেকে প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও শিল্প সরঞ্জাম আমদানির সুযোগ রয়েছে।
এ ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে দুই পক্ষই নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা ও তুলনামূলক সুবিধা কাজে লাগাতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প খাতের আধুনিকায়নের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, প্রতিটি চুক্তিতে দেশের সব খাতকে সমানভাবে লাভবান করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। বরং কোন খাতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে এবং চুক্তির ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের লাভ ও ব্যয় তৈরি হতে পারে, তা মূল্যায়ন করা জরুরি।
তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনাকে এমন প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়, যেখানে প্রতিটি খাতকে অবশ্যই সমান সুবিধা পেতে হবে। বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বাংলাদেশের বর্তমান প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দেশের অভ্যন্তরীণ বিধিবিধান, বাণিজ্যনীতি এবং সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তার বক্তব্যে উঠে আসে, শুধু বিদেশি বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির। তিনি বলেন, ২০২৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্কের প্রস্তুতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে পাওয়া কিছু অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি অব্যাহত রাখতে বিকল্প সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে আগেভাগেই কাজ করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা ব্যবস্থার আওতায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং বিকল্প অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য শক্তিশালী আলোচনাসক্ষমতা প্রয়োজন। কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে শুধু শুল্ক সুবিধা নয়, বিভিন্ন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ কারণে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোয় বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবর্তন দেখা দিলে অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই নতুন পণ্য ও শিল্প খাতে রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তাদের মতে, উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর হলে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের সুযোগ পেতে পারে। এর মাধ্যমে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় দেশের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের উপপ্রধান বাইবা জারিনা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়-পূর্ব ও পশ্চিম) ড. এম নজরুল ইসলাম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরীফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান।
স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. মাশেকুর রহমান।
সেমিনারের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়; বরং ভবিষ্যৎ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে ২০২৯ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় সামনে রেখে বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বর্তমান অগ্রাধিকারমূলক সুবিধায় সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলা করতে হলে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বার্তা হলো, ইউরোপের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশকে দ্রুত কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ জনবল এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।

