দেশে সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে এসব কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদন সক্ষমতার কারখানা গড়ে তোলা হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে সারের সরবরাহ জোরদার, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্থাটির অধীনে সাতটি সার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া এবং দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা। তবে এসব কারখানার উৎপাদন দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরিয়ার মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি দেশীয় উৎপাদনের বাইরে থেকে পূরণ করতে হয়েছে।
ফসফেটজাত সারের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা আরও বেশি। একই অর্থবছরে দেশে ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি সারের চাহিদা ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অথচ বিসিআইসির কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬৮ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার ৯ দশমিক ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি সারের চাহিদা ছিল ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে দেশীয় কারখানায় উৎপাদন হয়েছে ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার মাত্র ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ফলে এই দুই ধরনের সারের চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে।
সার আমদানির পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার কারণে সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ রয়েছে। বিসিআইসির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারে ২৩ হাজার টাকা, টিএসপি সারে ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপি সারে ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।
এ অবস্থায় দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সার সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নতুন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার।
পরিকল্পনার আওতায় সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর একটি হচ্ছে ভোলায় নতুন ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন। প্রস্তাবিত এই কারখানায় প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে কারখানাটি চালু রাখতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কারখানায় দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর।
এ বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বাসসকে জানিয়েছেন, দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলার প্রস্তাবিত কারখানাটি নির্মিত হলে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে ফসফেটজাত সারের উৎপাদন বাড়াতে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় নতুন টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। টিএসপিসিএল কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জায়গায় এই কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৪ লাখ মেট্রিক টন।
বর্তমানে বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে কাঁচামালের সংকট এবং উৎপাদন প্ল্যান্টের বিভিন্ন সমস্যার কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কারখানা স্থাপিত হলে টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে টিএসপি সারের সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বাড়তে পারে।
তৃতীয় কারখানাটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে নরসিংদীর পলাশে। সেখানে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ বা ইউএফ-৮৫ উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২৪ হাজার মেট্রিক টন।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি ও অবকাঠামো কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা জানিয়েছেন, পলাশের প্রস্তাবিত ইউএফ-৮৫ কারখানার বিষয়ে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজারের চাহিদা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারে।
নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক এবং কারখানা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত জনবলের চাহিদা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতেও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে এসব শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সহযোগী ব্যবসার কার্যক্রম বাড়তে পারে।
তবে নতুন কারখানাগুলোতে ঠিক কতজন মানুষের কর্মসংস্থান হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিসিআইসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো নয়, শিল্প খাতের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দেশের কৃষি উৎপাদনব্যবস্থায় সারের গুরুত্ব বিবেচনায় নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তন ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর দেশের নির্ভরতা রয়েছে।
এ অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কৃষি খাতে সার সরবরাহ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুবিধা অর্জন নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, কাঁচামাল ও অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর।
বিশেষ করে ভোলার ইউরিয়া কারখানার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ এবং চট্টগ্রামের টিএসপি কারখানার জন্য কাঁচামাল ও কারিগরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একইভাবে পলাশের ইউএফ-৮৫ প্রকল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি ও বাজার চাহিদার বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে বিসিআইসি। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষি খাতে সরবরাহ জোরদার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো এখনো পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অর্থায়ন, জ্বালানি ও কারিগরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরই এগুলোর বাস্তবায়ন এবং সম্ভাব্য সুফল সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

