দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আলাদাভাবে আবেদন করার পরিবর্তে একটি সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত কমানো এবং একাধিক আবেদন একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করতে গঠিত কমিটির দ্বিতীয় সভায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ১৯ অক্টোবর বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সভায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ ব্যবসা শুরুর অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার একটি কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে।
কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় ১২টি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন ও সেবার মধ্যে ১১টি মাত্র এক দিনের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব সেবা পেতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে মোট ১৬৭ থেকে ৩২৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে সরকার।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে আমদানির ঋণপত্র খোলার পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী বাজেটের আগেই ব্যবসা স্থাপনের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ১৪ দিনের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। এতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে বলে তিনি মনে করেন।
নতুন পরিকল্পনায় এক দিনের মধ্যে যেসব সেবা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের নামের ছাড়পত্র, প্রাথমিক ব্যাংক হিসাব খোলা, যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বর, নিয়মিত ব্যাংক হিসাব, অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভবনের নকশা অনুমোদন, আমদানি নিবন্ধন সনদ এবং ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর।
তবে আমদানি নিবন্ধন সনদের জন্য ইনভেস্ট বাংলাদেশের সুপারিশ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এক দিনের বেশি সময় লাগবে। বর্তমানে এই সুপারিশ দিতে ১০ দিন প্রয়োজন হয়। নতুন পরিকল্পনায় তা কমিয়ে সাত দিনে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সুপারিশ পাওয়ার পর আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানি নিবন্ধন সনদ এক দিনের মধ্যে ইস্যু করবে। বর্তমানে এই ধাপে প্রায় ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। ফলে নতুন পদ্ধতিতে আমদানি নিবন্ধনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থায়। প্রচলিত হাতে পরিচালিত ট্রেড লাইসেন্সের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় বার্ষিক ব্যবসা নিবন্ধন সনদ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। আবেদন যাচাই, সরেজমিন পরিদর্শন এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের কারণে এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত সাত থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
নতুন ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন মাধ্যমে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করলেই আবেদনকারী তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসা নিবন্ধন সনদ পাবেন। এ জন্য আগাম সরেজমিন পরিদর্শন বা আলাদা হাতে পরিচালিত অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
তবে এই পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স ফি বাড়বে না। বিদ্যমান ফি অপরিবর্তিত রেখে আদায়কৃত অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে নীতিগত সমন্বয় এবং কিছু বিধিবিধান সংশোধন প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে নতুন নিবন্ধন সনদের স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর, আমদানি নিবন্ধন এবং রপ্তানি নিবন্ধন সনদের আবেদনে নতুন সনদ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর ইতোমধ্যে একটি নতুন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নামের ছাড়পত্র এবং কোম্পানি নিবন্ধন এক দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে বিনিয়োগকারীরা নতুন স্বয়ংক্রিয় সেবাগুলো ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিবন্ধনের পরবর্তী ৫৪টি সেবা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্যও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
২০২৭ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে পরিদপ্তরের সব কার্যক্রম পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন সংশোধন এবং কোম্পানির সংঘস্মারকের কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কাজ চলছে।
পরবর্তী সময়ে কোম্পানি নিবন্ধনের অনলাইন ব্যবস্থাকে জাতীয় বাংলাবিজ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে ব্যবসা শুরুর বিভিন্ন অনুমোদন একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এই লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর হলেও নতুন ব্যবস্থায় তা বাড়িয়ে তিন বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ইতোমধ্যে অনাপত্তিপত্র ও লাইসেন্স দেওয়ার জন্য নতুন অনলাইন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। জাতীয় বাংলাবিজ ব্যবস্থার সঙ্গে এটি যুক্ত করতে অধিদপ্তর ছয় মাস সময় চাইলেও কমিটি নভেম্বরের মধ্যেই সংযুক্তির কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে।
সভায় বাংলাদেশের অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন ব্যবস্থার সঙ্গে কয়েকটি দেশের তুলনাও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। দুটি পৃথক আবেদন এবং একাধিক সরেজমিন পরিদর্শনের কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে বেসরকারি প্রকৌশলীদের মাধ্যমে তিন দিনের মধ্যে তিন বছর মেয়াদি লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে প্রতিবছর নিরাপত্তা পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ভারতে অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর এবং অনুমোদন পেতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে। ভিয়েতনামে ভবনের প্রাথমিক নকশা অনুমোদনের সময়ই অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি যাচাই করা হয়। সেখানে প্রায় ছয় দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং আলাদা অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্সের প্রয়োজন পড়ে না।
পরিবেশগত ছাড়পত্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংস্কার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ এক বছর হলেও নতুন পরিকল্পনায় শিল্পের ধরন অনুযায়ী তা তিন থেকে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া পরিবেশসংক্রান্ত গণশুনানি পুরোপুরি অনলাইনে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কারিগরি পর্যালোচনা কমিটিতে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।
পরিবেশগত পরীক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের স্বীকৃত পরীক্ষাগার এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফল গ্রহণ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে একই ধরনের পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন কমতে পারে এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।
আমদানি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান কিছু শর্ত শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আমদানি নিবন্ধন সনদ পাওয়ার আগে ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, আমদানি নিবন্ধন সনদ দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে এই দুটি চূড়ান্ত অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি আমদানি নিবন্ধন আদেশ সংশোধন করে পুরো আবেদন ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া অনলাইনে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, কোম্পানি নিবন্ধন, আমদানি অনুমোদন এবং বিভিন্ন ছাড়পত্র সংগ্রহের সময় কমলে বিনিয়োগকারীদের প্রাথমিক ব্যয় ও অপেক্ষা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব পরিবর্তন এখনো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত সমন্বয়, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি সংশোধন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩৫৫ দিনের অনুমোদনপ্রক্রিয়া প্রথমে ১৮ দিন এবং পরবর্তী সময়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত হতে পারে।

