জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে কপ-৩১ সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ১০ নভেম্বর ঢাকা ছাড়বেন তিনি। সম্মেলন শেষে ১২ নভেম্বর দেশে ফেরার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
১১ ও ১২ নভেম্বর সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা অংশ নেবেন। এই দুই দিন উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলানিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো যেন নতুন করে ঋণের বোঝায় না পড়ে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সায়মুম পারভেজ জানিয়েছেন, কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার তহবিলের অর্থ বাড়ানোর দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যাতে এই তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়, সে উদ্যোগও নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্মিলিতভাবে দাবি তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বন ও পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ছে। এই ক্ষতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে ক্ষয়ক্ষতি বাবদ অর্থ সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ।
জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের দাবি
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী এবার সংক্ষিপ্ত সফরে তুরস্ক যাবেন এবং বিশ্বনেতাদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবেন।
বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলন শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আয়োজন নয়। আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশের স্বার্থ তুলে ধরা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানানোর ক্ষেত্র হিসেবেও সম্মেলনটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সরকার।
শামা ওবায়েদ বলেন, সম্মেলনে জলবায়ু সহনশীলতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের অর্জন তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর প্রতি উন্নত বিশ্বের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হবে।
তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও গুরুত্ব
জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তুরস্কের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে এরদোয়ান বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আনতালিয়া সফরে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সফরের আগে কূটনৈতিক তৎপরতা
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছে। দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বৈঠক করেন।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কপ-৩১ সম্মেলনে অংশগ্রহণ, উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নবায়নযোগ্য ও সবুজ জ্বালানি এবং বাংলাদেশে তুরস্কের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে ২০২৭ সালের শুরুতে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্মেলনে তুরস্ককে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান হুমায়ুন কবির।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট সৌদি আরবের জেদ্দায় ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুলাকলিকায়ার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের বিষয়টি আলোচনায় আসে। দুই পক্ষ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এ ছাড়া গত ৬ জুন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ওই সফরে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। নিয়মিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন নিয়েও আলোচনা হয়।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে এসব সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

