প্রায় দুই বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে না পারা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প অবশেষে চালুর পথে এগোচ্ছে। প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রকল্পটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে। পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে তেল খালাস ও পরিবহন ব্যয় কমিয়ে বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা করছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় বিপিসির লিয়াজোঁ অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতি। বিপিসির পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সংস্থাটির পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক এবং পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর হ্যারিস আবদি সেমবিরিং মেলিয়ালা। অনুষ্ঠানে জ্বালানি বিভাগের প্রতিনিধি ও বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছর এসপিএম প্রকল্পের স্থাপনা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য চুক্তির মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে।
বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে।
দেশে আমদানি করা জ্বালানি তেল খালাসের প্রচলিত ব্যবস্থায় সময় ও ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এত দিন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে উপকূলে আনতে হতো। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে সেই তেল সংরক্ষণ ও পরিবহনের ব্যবস্থা করা হতো। এ প্রক্রিয়ায় বড় জাহাজের অপেক্ষার সময় বাড়ার পাশাপাশি ছোট জাহাজ ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় তৈরি হতো।
এসপিএম প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া সহজ করা। প্রকল্পটি চালু হলে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করা সম্ভব হবে। এতে জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রয়োজন কমবে এবং খালাসের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রে আসা বড় তেলবাহী জাহাজ বা মাদার ট্যাংকার প্রথমে একটি ভাসমান মুরিং বয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছাবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কালারমারছড়ায় নির্মিত সংরক্ষণ ট্যাংকে। পরবর্তী সময়ে অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে আমদানি করা পরিশোধিত ডিজেল সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য পৃথক পাইপলাইনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এ কে এম নইম উল্যা জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এসপিএম প্রকল্পের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় ভাসমান মুরিং, পাম্পিং স্টেশন, ট্যাংক ফার্ম এবং প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল পরিবহনের জন্য রয়েছে পৃথক পাইপলাইন ব্যবস্থা।
প্রকল্পটি চালু হলে তেল খালাসের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে প্রাক্কলন করেছে বিপিসি। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে ১ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল খালাস করতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। কিন্তু এসপিএমের মাধ্যমে একই পরিমাণ তেল মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় খালাস করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ আগে যে পরিমাণ তেল খালাস করতে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগত, নতুন ব্যবস্থায় তা মাত্র দুই দিনে সম্পন্ন করা যাবে। একইভাবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল খালাস করতে সময় লাগবে প্রায় ২৮ ঘণ্টা।
এতে বড় তেলবাহী জাহাজের অপেক্ষার সময় কমে আসার পাশাপাশি ছোট জাহাজ বা লাইটারেজ ব্যবহারের প্রয়োজনও হ্রাস পাবে। ফলে জাহাজ পরিচালনা, তেল স্থানান্তর ও পরিবহন খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিপিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, এসপিএম প্রকল্প পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে এই সাশ্রয় এখনো প্রাক্কলনভিত্তিক। প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর বাস্তবে কত পরিমাণ তেল পরিবহন করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালন ব্যয় কত হচ্ছে, তার ওপর প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে।
চীনের অর্থায়নে এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিল চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়।
২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতিতে বিলম্ব হওয়ায় প্রকল্পটি এত দিন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরও প্রায় দুই বছর ধরে এর প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সুফল পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তি প্রকল্পটি চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব পাওয়া পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পারতামিনা গ্রুপের সামুদ্রিক পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতের একটি প্রতিষ্ঠান। জাহাজ পরিচালনা, সামুদ্রিক পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্রভিত্তিক অবকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে এসপিএম প্রকল্প চালু হলেই এর পুরো উৎপাদন ও পরিবহন সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের সক্ষমতা এবং দেশের বিদ্যমান পরিশোধন অবকাঠামোর মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
প্রকল্পটির অপরিশোধিত তেল পরিবহন পাইপলাইনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ মেট্রিক টন। ফলে পাইপলাইনে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সুযোগ থাকলেও বর্তমান পরিশোধন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এর পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে না।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বা ইআরএল-২ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টন বাড়বে। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারির মোট বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তখন এসপিএম প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবহন করা অপরিশোধিত তেলের আরও বেশি অংশ দেশে পরিশোধন করা সম্ভব হবে। তবে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে আরও সময় প্রয়োজন হওয়ায় এসপিএম প্রকল্পের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এসপিএম প্রকল্পকে দেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাসের ব্যবস্থা কার্যকর হলে আমদানি করা জ্বালানি তেল দ্রুত সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুযোগ বাড়বে।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে তেলবাহী জাহাজের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তরের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এতে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসপিএম প্রকল্প দীর্ঘ বিলম্বের পর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঁচ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রকল্পটি চালুর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে প্রকল্পটির প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে নিয়মিত পরিচালনা, পর্যাপ্ত তেল পরিবহন এবং বিদ্যমান পরিশোধন সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহারের ওপর। বিশেষ করে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে এসপিএম প্রকল্পের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ আরও বাড়বে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা

