সিঙ্গাপুরে চাকরি করতে গিয়ে কয়েক মাসের বেতন না পেয়ে বিপাকে পড়েছিলেন বাংলাদেশের দুই শতাধিক অভিবাসী কর্মী। কারও বেতন বন্ধ হয়ে গেছে, কারও ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হয়েছে, আবার অনেকের হাতে দেশে ফেরার মতো টাকাও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের নতুন করে কাজের সুযোগ তৈরি করতে নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয় ও মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার (এমডব্লিউসি)। ইতোমধ্যে ২৩০ জনের বেশি অভিবাসী কর্মীকে সম্ভাব্য নতুন নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন, আবার কয়েকজন বকেয়া বেতনও হাতে পেয়েছেন। এতে কর্মীদের অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটলেও সবার চাকরি ও পাওনা নিশ্চিত হয়নি।
এই পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় রাজশাহীর তরুণ অভিবাসী কর্মী রব্বানী মো. গোলামের ঘটনায়। গত এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ নিয়ে যান তিনি। সেখান থেকে যা আয় করতেন, তার প্রায় পুরোটাই দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। নিজের কাছে রাখতেন সামান্য কিছু টাকা। কিন্তু গত আগস্ট থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে বেতন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই মাসের বেতন বকেয়া থাকলেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হারান তিনি। একপর্যায়ে তাঁর ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল হয়ে যায়। তাঁর হাতে অবশিষ্ট ছিল ১০ সিঙ্গাপুর ডলারেরও কম।
এ অবস্থায় গত ৬ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি চাকরি মেলায় অংশ নেন রব্বানী। সেখানে একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান তাঁকে কাজের প্রস্তাব দেয়। নতুন কাজের সুযোগ পেয়ে তিনি আবারও পরিবারের জন্য আয় করার আশা করছেন। গত এক মাস তাঁকে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে চলতে হয়েছে বলে দ্য স্ট্রেইট টাইমসকে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতো আরও অনেক কর্মী এখন নতুন নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের ২৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি কর্মী সাব্বির আলমও কয়েক মাসের বেতন না পেয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তাঁর আয়ের ওপর চার সদস্যের পরিবার নির্ভরশীল। নভেম্বরের শুরুতে তিনি বকেয়া বেতন পেয়েছেন। পাশাপাশি নতুন একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। সাব্বিরের ভাষায়, বেতন না পাওয়া এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কায় গত কয়েক সপ্তাহ তাঁদের জন্য খুব কঠিন ছিল। এখন নতুন কাজের সুযোগ পাওয়ায় আবার পরিবারকে টাকা পাঠানোর আশা করছেন তিনি।
সিঙ্গাপুরে বেতন না দেওয়ার এই ঘটনা মূলত প্রসেস খাতের দুটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। এগুলো হলো প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস এবং জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ২৪০ জন অভিবাসী কর্মী বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। গত আগস্ট থেকে বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিটও ধাপে ধাপে বাতিল করা শুরু হয়।
প্রসেস খাত বলতে মূলত শিল্পকারখানা, উৎপাদনকেন্দ্র এবং বিশেষায়িত স্থাপনায় যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, নির্মাণ ও পরিচালনাসংক্রান্ত কাজকে বোঝায়। সিঙ্গাপুরের জুরং আইল্যান্ডের মতো শিল্পাঞ্চলে এ ধরনের কাজের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বেতন না পাওয়ায় তাঁদের আয় ও কর্মসংস্থান দুটোই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিষয়টি সামনে আসার পর দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।
দ্য স্ট্রেইট টাইমসের ৭ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনসের প্রায় ১২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর বকেয়া বেতনের বেশির ভাগই পরিশোধ করা হয়েছে বলে ওই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী জানিয়েছেন। তবে জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের কয়েকজন কর্মী তখনো বেতন পাননি। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পাওনা পরিশোধে অগ্রগতি হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। তদন্ত শেষ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
কর্মীদের নতুন চাকরি খুঁজে দিতে গত ৬ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের সেংকাং ওয়েস্ট এলাকায় জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের অভিবাসী কর্মীদের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে বিশেষ চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়। এতে নির্মাণ ও প্রসেস খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার, সিঙ্গাপুর কন্ট্রাক্টরস অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড, অ্যাসোসিয়েশন অব প্রসেস ইন্ডাস্ট্রি এবং নিয়োগসংস্থাগুলো যৌথভাবে এ উদ্যোগে কাজ করেছে।
এখানে কর্মীদের আগের কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনুযায়ী সম্ভাব্য নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। শুধু আগের খাতেই কাজ করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা না রেখে নির্মাণ খাতেও কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজন কর্মী জানিয়েছেন, আগে তাঁরা মনে করেছিলেন প্রসেস খাতের বাইরে কাজের সুযোগ পাবেন না। নতুন উদ্যোগে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁদের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। তবে চাকরি মেলায় সাক্ষাৎকার দেওয়া মানেই সবার চাকরি নিশ্চিত হওয়া নয়। নিয়োগকর্তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় ওয়ার্ক পারমিট পরিবর্তনের অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরির পাশাপাশি কর্মীদের অস্থায়ী আবাসন, খাবার এবং আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। গত ৩ নভেম্বরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। যাঁদের দৈনন্দিন খাবারের ব্যবস্থা ছিল না, তাঁদের জন্য মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার খাবার সরবরাহ করেছে। সংস্থাটির আগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ জন কর্মীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ ছাড়া বকেয়া বেতন আদায়ের জন্য আইনি দাবি দাখিলেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হলেও কর্মীদের সামনে সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রশ্ন হলো আগের প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা বেতন আদায় করা। মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার জানিয়েছে, তারা ২৩০ জনের বেশি কর্মীকে সহায়তা করছে। তাঁদের ৯০ শতাংশের বেশি বকেয়া বেতনের দাবিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছেন। সিঙ্গাপুরের ট্রাইপার্টাইট অ্যালায়েন্স ফর ডিসপিউট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে এসব দাবি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। তবে কতজন কর্মী কত টাকা পাবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এর কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তারা সব বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে সক্ষম না-ও হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সহায়তায় মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড থেকে জরুরি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে খাবার, আবাসন, দৈনন্দিন প্রয়োজন এবং বকেয়া বেতনসংক্রান্ত সংকটে থাকা কর্মীদের সহায়তা করা হয়।
আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো বিদেশে যাওয়ার খরচ। দ্য স্ট্রেইট টাইমসের আগের এক প্রতিবেদনে কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মী জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে তাঁরা নিয়োগ এজেন্টদের ১২ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারেরও বেশি পর্যন্ত দিয়েছেন। ফলে চাকরি হারানোর পর শুধু আয় বন্ধ হওয়াই নয়, বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও তাঁদের ওপর পড়েছে। ২১ বছর বয়সী সাইমন ইসলাম জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে আসার জন্য নেওয়া ৬ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারের ঋণ তাঁকে এখনো পরিশোধ করতে হবে। তাঁর তিন মাসের বেতনও বকেয়া রয়েছে। তাই আগের পাওনা না পেলেও নতুন কাজ শুরু করা তাঁর জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে বকেয়া বেতনের অভিযোগ নিয়ে সহায়তা চাওয়া কর্মীর সংখ্যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এটি দেশটির অভিবাসী কর্মীদের বেতনসংক্রান্ত সমস্যার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তুলে ধরছে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। গত ২৬ অক্টোবর হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তারা সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে সহযোগিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে কর্মীদের পাওনা আদায়, নতুন চাকরি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিয়ম খতিয়ে দেখা জরুরি।
সব মিলিয়ে সিঙ্গাপুরে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য স্বস্তির খবর। তবে একটি চাকরি পাওয়া মানেই তাঁদের সংকটের সমাধান নয়। বকেয়া বেতন আদায়, আগের ঋণের বোঝা কমানো এবং নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে বৈধভাবে কাজ শুরু করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর সময় এজেন্টের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং চাকরির শর্ত সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগগুলোও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ বিদেশে কাজ করতে যাওয়া একজন শ্রমিক শুধু নিজের জীবিকা গড়তে যান না, তাঁর আয়ের ওপর দেশে থাকা একটি পরিবারও নির্ভর করে। সেই আয়ের নিশ্চয়তা না থাকলে বিদেশে কর্মসংস্থানের পুরো উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

