নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা না গেলে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী নারী। তাঁদের বাদ দিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণন, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) প্রাঙ্গণে জাতীয় এসএমই নারী উদ্যোক্তা সামিট ও পণ্য মেলা ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নারী উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ৮১টি কূটনৈতিক মিশনকে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের সম্ভাব্য বাজার ও চাহিদা খুঁজে বের করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোন দেশে বাংলাদেশের কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের যোগাযোগ তৈরি করতে মিশনগুলো কাজ করবে।
বিদেশি কূটনীতিক, মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের সামনেও বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তাঁদের পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এসএমই ফাউন্ডেশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ করার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ কোনো সুবিধা বা অগ্রাধিকার প্রয়োজন নেই। অন্য উদ্যোক্তাদের মতো তাঁরাও ন্যায্য অধিকার ও সমান সুযোগ চান। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ব্যবসায়ী পরিচয়ের আগে নারী পরিচয়কে আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে না।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তাদের উদাহরণ তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, যশোরে কেউ নকশিকাঁথা তৈরি করছেন, রংপুরে কেউ শতরঞ্জি বানাচ্ছেন, আবার চট্টগ্রামের কোনো তরুণী অনলাইনে খাবারের ব্যবসা করছেন। কিন্তু পণ্য বাজারজাতকরণ, নতুন ক্রেতা খুঁজে পাওয়া, অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে তাঁদের অনেকেই ব্যবসা বড় করতে পারছেন না।
এসব বাধা দূর করতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সমন্বিত সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ব্যাংকঋণ সহজ করা, অর্থায়ন এবং বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করবে বলে জানান।
সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, শিল্পকলা, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, নাটক, নাচ, পাটজাত পণ্য, প্রসাধনী ও গহনার মতো পণ্য এই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। দেশীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করতে এই সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
নারী শিক্ষার বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেয়েদের প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও সরকার কাজ করছে। নারী শিক্ষার প্রসার ঘটলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নিজেকে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক নারী উদ্যোক্তার পেছনে সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প রয়েছে। এসব গল্প দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্মের মেয়েরা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন।
অনুষ্ঠানে দেশের আট বিভাগের আটজন নারী উদ্যোক্তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের সাগুফতা সুলতানা, চট্টগ্রামের মঞ্জুলিকা চাকমা, সিলেটের শান্তনা, ময়মনসিংহের হেনা খাতুন, রাজশাহীর আফরোজা আজিজ মুন্নি, রংপুরের উম্মে কুলসুম পপি, বরিশালের বিলকিস আহমেদ লিলি এবং খুলনার মরিয়ম নার্গিস রয়েছেন।
সম্মাননা পাওয়া উদ্যোক্তা সাগুফতা সুলতানা বলেন, উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের দক্ষতা ও পণ্যের মান উন্নয়নে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অনেক নারী মাত্র কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু একটি ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দরকার।
তিনি নারী উদ্যোক্তাদের ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত এ ধরনের সামিট আয়োজনের আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গত ৫ নভেম্বর ‘নারী উদ্যোক্তার অগ্রযাত্রায় সমৃদ্ধ হবে আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে তিন দিনব্যাপী এই সামিট ও পণ্য মেলা শুরু হয়। এতে প্রায় ৬০টি স্টলে নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী, খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, গহনা ও অন্যান্য পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতা সংযোগ, ব্যবসায়িক আলোচনা ও প্রশিক্ষণমূলক আয়োজনও ছিল।

